fairnews24 Logo

সংশোধনীর রায় : বিচার মানি তাল গাছ আমার...

মোমিন মেহেদী | 21 Aug 2017   08:24:31 PM   Monday
 সংশোধনীর রায় : বিচার মানি তাল গাছ আমার...

ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ে সরকার এবং দলীয়ভাবে আওয়ামী লীগ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।  আর এতটাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে যে, যখন যে, যেখানে যেভাবে পারছে পাগলের প্রলাপ বকার মত বকেই যাচ্ছে। যা বর্তমান আওয়ামী রীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের দূর্বলতাকে জনগনের সামনে পরিস্ফুটিত করছে। বিশেষ করে যখন বলা হচ্ছে- ওই রায়ে আমরা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছি। রাজনৈতিকভাবে বিরোধীপক্ষের হাতে ইস্যু তুলে দেয়া হয়েছে। বিএনপি এতদিন সরকারের বিরুদ্ধে যেসব কথাবার্তা বলে আসছিল সেগুলোই রায়ের পর্যবেক্ষণে এসেছে। এমনকি রায়ে বিগত নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। রায়ে জাতীয় সংসদ ও নির্বাচন কমিশনকে অপ্রাসঙ্গিকভাবে টেনে আনা হয়েছে। এমনকি প্রশ্ন তোলা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর একক নেতৃত্ব নিয়ে। তাই আওয়ামী লীগ বিষয়টিকে আইনিভাবে মোকাবেলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। শুধু কি এখানেই শেষ! দেশ এতটাই অন্ধকারের দিকে ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে আওয়ামী লীগের পাতানো প্রধান বিচারপতির রায়ে আবার বিএনপির নেতারা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াও প্রকাশ করছেন। তারা এতদিন অকার্যকর সংসদ ও নির্বাচন কমিশন এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে সরকারের নির্লজ্জ দলীয়করণ, দুর্নীতি ও মানবাধিকার লংঘনের বিষয় নিয়ে যা যা বলে আসছিলেন ষোড়শ সংশোধনী রায়ের পর্যবেক্ষণে সেগুলোই উঠে এসেছে। এজন্য আওয়ামী লীগ রায় নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছে। তাদের মতে, এ রায়ের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ মনে করছে বিচার বিভাগ তাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে। তাই তারা বিচার বিভাগকে চাপে রাখতে নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছে। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের পর্যবেক্ষণে তাদের জনস্বার্থে আইনগতভাবে সুযোগ নেয়ার অনেক কিছু আছে। প্রয়োজনে তারা সেদিকে যাবেন। যেমন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনাসহ বর্তমান সরকারের অনেক বিষয়কে চ্যালেঞ্জ করে রিট করতে পারেন। এমনকি ৫ জানুয়ারির নির্বাচন কেন অবৈধ হবে না সে বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে যে কোনো নাগরিক বিচার বিভাগের দ্বারস্থ হতে পারেন। তবে তারা হুট করে কিছু করবে না। সময় নিতে চান। এই সময়ের রাস্তায় আমাদেরকে এগিয়ে যেতে যেতে তৈরি হতে হবে বাংলাদেশকে রক্ষার জন্য। তা না হলে ‘পাটায়-পুতায় ঘষাঘষি’র মত আওয়ামী লীগ-বিএনপির বিবাদে ক্ষতিগ্রস্থ হবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ। ঠিক যেভাবে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ক্রমশ সমস্যায়-অন্ধকারে গত ৪৭ বছর চলে গেছে আমাদের। ভোট ও ভাতের অধিকার গেছে, মৌলিক ৫ টি অধিকার ঝুলে আছে নাকের ডগায়; তার উপর আবার উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে নিতে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব সংসদে পাস হয়, যা ষোড়শ সংশোধনী হিসেবে পরিচিত। নয়জন আইনজীবীর রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০১৬ সালের ৫ মে সংবিধানের ওই সংশোধনী ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে রায় দেন। ৩ জুলাই আপিল বিভাগও ওই রায় বহাল রাখেন। যার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ পায় ১ আগস্ট। রায়ের পর্যবেক্ষণে এক স্থানে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘মানবাধিকার ঝুঁকিতে, দুর্নীতি অনিয়ন্ত্রিত, সংসদ অকার্যকর, কোটি মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত।’ ৭৯৯ পৃষ্ঠার রায়ে সরকার, সংসদ, রাজনীতি, নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, সামরিক শাসন এবং রাষ্ট্র ও সমাজের বিষয়ে এমন অনেক পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে।

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে-‘এক্সপাঞ্জ’র উদ্যোগ নেয়া হবে। সেই চেষ্টার অংশ হিসেবে রায় পর্যালোচনা করছে সরকার। যেহেতু এখনও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হয়নি, তাই রায় নিয়ে এর বেশি এখন আর কিছু বলতে চাই না।’ তবে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা রায়ে তাদের ক্ষতি ও ক্ষোভের দিকটা তুলে ধরেন। রায়ে আমাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার অনেক কারণ আছে। এতে বলা হয়েছে, গত নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি। বঙ্গবন্ধুর বিষয়ে বলা হয়েছে, কারও একক নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়নি।

এই দেশে সবাই মিলেই মুক্তিযুদ্ধ করেছিলো। এর মধ্যে একটা কথা বলা উচিত ছিল। সেটা হল, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। সেটা না বলা হলে বঙ্গবন্ধুকে ছোট করা হয় এবং বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে বর্তমানে অন্যান্য রাজনৈতিক দল যেসব কথা বলছে, সেটাকে উৎসাহিত করা হয়। এই বর্তমানে নিজের মত করে এগিয়ে যাচ্ছে ‘অপরিপক্ব’ প্রধান বিচারপতি। আর একারনেই প্রধান বিচারপতিকে উদ্দেশ্য করে বলছি- রায়ে অপ্রাসঙ্গিক যেসব কথাবার্তা এসেছে সেগুলো উনি (প্রধান বিচারপতি) এক্সপাঞ্জ করে নিন। একটা দেশের মধ্যে ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং তাদের প্রতিনিধি সংসদ সদস্যরা। এখন বিচার বিভাগকে যদি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। তাহলে তো বিচার বিভাগের সঙ্গে সরকারের মুখোমুখি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এই পরিস্থিতির উত্তরণ চাই। আর তাই নির্ভয়ে বলতে চাই- সরকারের চিন্তা-চেতনার প্রতিফলন রায়ে ঘটেনি। একাত্তরের পরাজিত শক্তি প্রতিনিয়ত চেষ্টা করছে দেশকে অস্থিতিশীল করতে, জঙ্গি তৎপরতা চালাচ্ছে- এ প্রেক্ষপটে সরকার ষোড়শ সংশোধনী করেছিল; কিন্তু সেটা বাতিল করে দিয়ে যে রায় হল, তাতে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা বা সরকারের যে ইচ্ছা তার প্রতিফলন ঘটেনি। এছাড়া সামনে নির্বাচন আসছে। রায়ে নির্বাচন এবং নির্বাচন কমিশনের ব্যাপারে বিরূপ মনোভাব পোষণ করা হয়েছে। এ কারণেই বাংলাদেশ সংক্ষুব্ধ। রায়ে রাজনৈতিক যে দিক এসেছে, তাতে বিরোধীপক্ষ সুবিধা নেয়ার জন্য চেষ্টা করছে। তাই এ রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ পরেই করা উচিত।

নতুনধারা বাংলাদেশ এনডিবির রাজনীতিকগণ বলতে চাই- বিচার্য বিষয় ছিল ‘প্রমাণিত অসধাচরণ বা অসামর্থ্যতার জন্য বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদের হাতে থাকা। সুপ্রিমকোর্ট সেটা বাতিল করে দিয়েছেন। আর এ রায় দিতে গিয়ে তিনি (প্রধান বিচারপতি) অপ্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে এসেছেন পর্যবেক্ষণে। কোনো একক নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়নি। এরকম কিছু বিষয়ে আমাদের চরম আপত্তি রয়েছে। জাতীয় নেতৃত্বকে বলেছেন ‘আমিত্ব’। কটাক্ষ করে কথা বলেছেন। এগুলো ক্ষতির কারণ। প্রধান বিচারপতির কাছ থেকে এরকম একতরফা মন্তব্য আশা করিনি। কারণ সংসদ ও নির্বাচন কমিশন মামলার পক্ষ ছিল না। আর পক্ষ না হলে কারও বিরুদ্ধে একতরফা মন্তব্য করা যায় না। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে অপরিপক্ব বলায় দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। দলের নমিনেশনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পর্যবেক্ষণে মনোনয়ন সম্পর্কেও বলেছেন। আমরা এখন আইনানুগভাবে এগুলো মোকাবেলা করব। এর একমাত্র উপায় হল রিভিউ করা।

ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের বিষয়টি বিচার্য ছিল না। বিচার্য বিষয় ছাড়া যেগুলো রায়ে নিয়ে আসা হয়েছে সেগুলো নিয়ে আপত্তি উঠছে। বিচার্য বিষয় হল, সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ। সংসদে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা নিয়ে। তাও তো তদন্ত করার জন্য একটা আইন করতে হবে। সে আইনটি হয়নি। তার আগেই এটা চ্যালেঞ্জ হয়ে বাদ হয়ে গেছে। এখন আপত্তি উঠছে সংসদের পরিপক্বতা নিয়ে কথা বলায়। সরকার ভালোভাবে চলছে না, দুর্নীতি হচ্ছে- এসব বলায় প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

গ্রাম বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, আর তা হলো- ‘বিচার মানি, তালগাছ আমার’। এমন একটা বিষয় আজ আওয়ামী লীগের সামনে। আওয়ামী লীগ যেন বলছে- আমি এমন কিছু বলব না। তবে সর্বোচ্চ আদালতের রায় আমাদের মানতে হবে। এ রায়ে আমাদের উদ্বেগের অনেকগুলো কারণ সৃষ্টি হয়েছে। এ রায়ের পর্যবেক্ষণে জাতীয় সংসদ, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব এবং ১১৬ অনুচ্ছেদ- এগুলো মিলে এমন একটা অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, যা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ইস্যু হিসেবে নিয়েছে। হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। কিন্তু রায়কে রাজনীতিকরণ করা ঠিক হয়নি। সে জন্যই আমাদের আক্ষেপ। রায়টি আইনগতভাবে দেখা হবে। তবে এ যে পর্যবেক্ষণ দেয়া হল তাতে আমি মনে করি, এগুলো ‘সুয়োমুটো’ প্রত্যাহার করা উচিত। কেননা, যারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত তাদের বিষয়ে। রায়ে সংসদ সম্পর্কে মন্তব্য করা হয়েছে। এটা সর্বোচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণে আসা দরকার ছিল না। আমি নতুন রাজনীতিক-কলামিস্ট সমাজ দাবি করেছি, পর্যবেক্ষণগুলো যেন প্রত্যাহার করা হয়। সুয়োমুটো এক্সপাঞ্জ করা হোক।

এমন একটা রায়ের পর রাজনীতির পাশাপাশি আইনি সুবিধাও চায় বিএনপি। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় এবং পরবর্তী পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে মাঠের বিরোধী দল বিএনপি। রায় ও পর্যবেক্ষণের ফলে সরকারের মধ্যে সৃষ্ট অস্থিরতাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে চায় দলটি। রাজনীতির পাশাপাশি আইনগত সুবিধা নেয়া যায় কিনা সে লক্ষ্যে রায় ও পর্যবেক্ষণের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। দলের সিনিয়র কয়েকজন আইনজীবী এ নিয়ে কাজ করছেন। ইতিমধ্যে তারা কয়েক দফা বৈঠকও করেছেন। শুধু ষোড়শ সংশোধনী নয় এসব আলোচনায় বাতিল হওয়া ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায়ের বিষয়টিও আসছে। ওই রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ করা যাবে কিনা তা নিয়েও আলোচনা করেছেন তারা। এভাবে বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে যা কিছু হয়েছে; তার জন্য দায়ী অবশ্য আমাদেরই। কেননা, আমরা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে জেগে থাকি। উত্তরণ চাই এই সময়ের; চলুন-জাগুন



মোমিন মেহেদী : চেয়ারম্যান, নতুনধারা বাংলাদেশ-এনডিবি এবং উপদেষ্টা, জাতীয় শিক্ষাধারা

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
কপিরাইট © 2018-09-18 এফএনএস২৪.কম কর্তৃক সর্ব স্বত্ব ® সংরক্ষিত।