fairnews24 Logo

খনন প্রকল্পের প্রথম পর্যায় কাজ শেষ আপন মহিমায় কপোতাক্ষ নদ

এফএনএস (মোঃ মুজিবুর রহমান; পাটকেলঘাটা, সাতক্ষীরা) : | 17 Apr 2018   01:03:17 PM   Tuesday
 খনন প্রকল্পের প্রথম পর্যায় কাজ শেষ আপন মহিমায় কপোতাক্ষ নদ

কপোতাক্ষ অববাহিকার হাজার হাজার মানুষের অভিশাপের নদ আজ আশীর্বাদেপরিণত হওয়ায় আনন্দের যেন শেষ নেই।
কপোতাক্ষ নদের জলবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্পের কাজ প্রথম পর্যায়ে শেষ হওয়ায় সুফল ভোগ করছে পাঁচটি উপজেলার প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ। ফলে নদ অববাহিকায় ১২০০০০ হেক্টর অনাবাদি জমি এখন ৩ ফসলই জমিতে রূপান্তির হয়েছে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়েছে তীরবর্তী গ্রামের খেটে খাওয়া দিন মজুর মানুষের। জেলে পল্লী গুলো আবারও জেগে উঠেছে মাছ আহরণ করে জীবন জীবিকা সংগ্রহে। নদের মিঠাপানি সংযুক্ত খালের মাধ্যমে ফসলী এলাকায় প্রবাহিত হওয়ায় কৃষকদের জমি কর্ষণে যেন অন্ত নেই। গত কয়েক বছর পূর্বেই যেসমস্ত আবাদি জমি বছরে ৬ মাস অনাবাদি হয়ে জলবদ্ধতার করাল গ্রাসে নিমজ্জিত থাকতো। এখন তাতে আমন ধান, বোরো ধান ও পাট সহ ভুট্টা, আখ, ডাল জাতীয় ফসল, সবজি সহ নানা জাতের ফসল উৎপাদিত হচ্ছে। ফলে কপোতাক্ষ নদ অববাহিকার মানুষের অভিশাপ হলেও এখন তা আর্শিবাদ।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০০ সালের পূর্ব হতে কপোতাক্ষ নদের বুকে পলি জমি ভরাট হতে থাকে। ফলে নৌযান চলাচল সহ নানা প্রতিবন্ধকতার শিকার হত অববাহিকার মানুষ। নদের বুকে পলি ভরাটের পরিমাণ এতটাই বৃদ্ধি পায় যে, বর্ষ মৌসুমে নদ তার বুকে পানি ধরে রাখতে না পেরে  উগ্রে দিতো তীরবর্তী গ্রামে। নদের উগ্রে দেওয়া পানিতে গ্রামের পর গ্রাম, ফসলী জমি, মৎস্য ঘের, পুকুর, বসত ভিটা, পানের বরজ প্লাবিত হত। প্রতি বছরই জলবদ্ধতার আকার প্রকট হতে থাকে। এর থেকে পরিত্রাণের জন্য ২০০৫ সাল হতে কপোতাক্ষের বুক থেকে পলি অপসারণের কাজ শুরু হয়।
১৩/৯/২০১১ সালে ২৬১৫৪৮৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নদ খননের প্রকল্প গ্রহন করে যশোর, পানি উন্নয়ন বোর্ড। দীর্ঘ নদের পুরোটাই বরাদ্ধকৃত অর্থে খনন করা সম্ভব না হওয়ায় প্রকল্পটি ভাগ করা হয়। প্রথম ভাগে যশোর জেলার মনিরামপুর উপজেলার চাকড়া ব্রিজ হতে সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার পাখি মারা ৮২ কিলোমিটার পর্যন্ত নদ খনন কার্যক্রম শুরু হয়। গত ২০১৭ সালের অর্থ বছরেই প্রকল্পটির ২৬৬০১.৪৫ লক্ষ টাকা  ব্যয়ে খনন কাজ শেষ করা হয়। এর মধ্যে সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার পাখি মারা বিলে ১৫৫৬ একর জমিতে ১১/৭/২০১৫ তারিখ হতে ৫ বছর মেয়াদী টিআরএম কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ১৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে বুড়িভদ্রা নদী খনন, কপোতাক্ষ নদের সঙ্গে সংযুক্ত ৯৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে ৭টি খাল খনন করা হয়। এ ছাড়া নদের দু’ধারে ২১ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ নির্মান, ১৪ টি নিস্কাশন অবকাঠামো নির্মান, টিআরএম লিং ক্যানেলে ৯৬০ মিটার দৈর্ঘ্যরে তীর প্রতিরক্ষা কাজ বাস্তবায়ন করা হয়।
সরেজমিন কপোতাক্ষ নদ খনন প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে শেষ হওয়ায় অববাহিকায় মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কপোতাক্ষ নদ এখন আপন মহিমায়। নদের দু’ধারে বাঁধ নির্মান করে পানি নিস্কাশন ব্যবস্থা অব্যহত রাখতে লিং চ্যালেঞ্জ তৈরী করায় নদ খননের প্রত্যক্ষ পরোক্ষ সুফল ভোগ করছে অববাহিকার মানুষ। কথা হয় কেশবপুর উপজেলার বয়বৃদ্ধ চিংড়া গ্রামের আবদুল মজিদ, মনিরামপুর উপজেলার রাজগঞ্জ গ্রামের শাহাবুদ্দীন শেখ, ত্রিমহনী গ্রামের কৃষক আবদুল আজিজ, কলারোয়া উপজেলার যুগিখালী গ্রামের আবদুর রহমান, তালা উপজেলার দাদপুর গ্রামের আবদুল মান্নান, পাটকেলঘাটার গিয়াসউদ্দীন, পাইকগাছা উপজেলার কাশিমনগর গ্রামের দ্বীন মাহমুদ সহ একাধিক ভুক্তভোগীর সাথে। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন কপোতাক্ষ নদের বুকে পলি জমে নদ অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছিলো। ফলে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে ফসলী জমি, মৎস্য ঘের, ভাসিয়ে বসত ঘর ছেড়ে উঁচু রাস্তার ধারে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বারান্দায়, ছাদে, পশু পাখির সাথে মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়েছে এ অঞ্চলের মানুষের। বন্ধ ছিল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো। মানুষ মারা গেলে শেষ কাজ দাফন ব্যবস্থার জন্য একটুকরো জমিও জেগে ছিলো না। মৃত ব্যক্তিকে দাফনের জন্য অন্য উপজেলার আত্মীয়র বাড়িতে ধর্না দিতো হত। বর্তমান কপোতাক্ষ নদ খনন অব্যহত থাকায় গত ২ বছর যাবৎ জলবদ্ধতার কবল থেকে মুক্তি পেয়েছে অববাহিকার লক্ষ লক্ষ মানুষ। নদের বুকে চলছে নৌযান। তীরবর্তী ফসলী জমি সবুজের হাতছানি। কপোতাক্ষ নদ যৌবন হারিয়ে নিজকে অভিশাপে পরিণত করলেও বর্তমান আর্শিবাদ।  কবির ভাষায় ‘কিন্তু এ ¯েœহের তৃষ্ণা মেটি কার জলে? দুগ্ধ ¯্রােতোরূপী তুমি জন্মভূমি স্তনে’।
কপোতাক্ষ নদ খনন প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রদূত যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী জানিয়েছেন বিশাল দৈর্ঘ্যরে কপোতাক্ষ প্রথম পর্যায়ে খননের আওতায় এনে ৫টি উপজেলার হাজার হাজার মানুষের জীবন জীবিকার সুুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। একইভাবে দ্বীতীয় পর্যায়ে জালালপুর বিলে টিআরএম প্রকল্প অব্যহত রাখা হবে। সাথে শালিখা নদের সুইজ গেট হতে বিজ্ঞানী স্যার পিসি রায়ের বাড়ি হয়ে কাটাখালী হয়ে চানদুড়িয়া পর্যন্ত আরও ৩০ কিলোমিটার নদ খনন করা হবে। এ ছাড়া নদের মিলিত স্থান পাইকগাছা শীবসা নদী পর্যন্ত নদ পুন:জীবিত করতে খনন প্রকল্প অব্যহত রাখতে অনুমদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এ ছাড়া বর্তমান ক্রচড্যাম এর মাধ্যমে পলি নিয়ন্ত্রন ও টিআরএম এর মাধ্যমে ভাটী অঞ্চলে প্রকৃতিক ভাবে খনন চলছে। দ্বিতীয় মেয়াদে অনুমোদন হলে নদের উপরের অবশিষ্ট অংশ খনন করা হবে। ফলে ১৯৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে কপোতাক্ষ নদ আপন গতিতে ফিরবে। বর্তমান উভয়ঞ্চলে জোয়ার ভাঁটা প্রবাহিত হচ্ছে। অববাহিকার মানুষের প্রাণের দাবি বর্তমান সরকার কপোতাক্ষ নদ দ্বিতীয় মেয়াদে খনন প্রকল্পের কাজ অতি দ্রুত শুরু করা হবে।   

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
কপিরাইট © 2018-11-14 এফএনএস২৪.কম কর্তৃক সর্ব স্বত্ব ® সংরক্ষিত।