fairnews24 Logo

ওপার বাংলার কবি বনলতা সরকার -এর কবিতা

এফএনএস সাহিত্য: | 21 Mar 2017   08:02:06 PM   Tuesday
 ওপার বাংলার কবি বনলতা সরকার -এর কবিতা

বিকেলে ভোরের ফুল
মাঝ বয়সী অমিত
ভরপুর তার সংসার,
জীবনের গতি তার ছন্দবদ্ধ
অফিস বাড়ি মেয়ের সাথে দুষ্টুমি
স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা
এই ছিল অমিতের স্বর্গ।
ছন্দ পতন হতেও দেরী হলো না বেশী
বন্ধুদের সাথে একদিন এক বিয়ে বাড়িতে
দেখলো সে একটি মেয়ে কে
চারি চক্ষুর মিলন হলো তৎক্ষণাৎ
তার জীবনে বিকেলে ভোরের ফুলের মতো
এলো লাবন্য
তার মন ভরে উঠলো
অদ্ভুত এক ভালো লাগায়
জানতে পারলো, লাবন্য বিবাহিতা
চোখে চোখে কত কথাই বলা হলো তাদের
লাবন্য রাজী হয় না
তার সংসার স্বামী কি করে ছাড়বে সে?

বেচারা অমিত,
সে আগের মতো সময় দেয় না
তার স্বর্গ কে বুকের মাঝে কষ্টের ভার
সব কথা বলে দিল স্ত্রীকে
কোন মেয়েই বা পারে মেনে নিতে?
শুরু হলো সংসার ভাঙ্গার যুদ্ধ
যা গড়তে তাদের লেগেছিল
বেশ কিছু বছর এক লহমায় তা ছাড়খার
বিবাহ বিচ্ছেদ হতে দেরী হলো না।
মেয়ে থাকবে মায়ের কাছে

একা হয়ে গেল অমিত
চেষ্টা করলো দেখা করতে লাবন্যের সাথে
কিন্তু হয় না দেখা।
অবশেষে সেই কাঙ্খিত সময় টি এলো
অমিতের জীবনে
রাজী হয়েছে লাবণ্য দেখা করতে
কিশোর বয়সে প্রেমে পরলে
সবাই যা করে
অমিতের মধ্যেও কাজ করছে উত্তেজনা
বুক ঢিপ ঢিপ করছে লজ্জা পায় সে।
যদি রাস্তায় দেরী হয়
নির্দিষ্ট সময়ের আধ ঘন্টা আগেই
পৌঁছে যায় অকূল স্থলে

ব্যস্ত নগরীর সরু গলি
সেখানে অমিত খুঁজে পায় তার লাবন্যকে
এলোমেলো চুল দুলছে দক্ষিণা সমীরণে
আঁখি ছলছল
কর্ম ব্যস্ত নগরী থমকে দাঁড়ায় ক্ষনিকের জন্য
অজানা নগরীর নতুন ঠিকানায়
নব যৌবনে ফিরে যায়
অমিত লাবণ্য।


খোলা চিঠি (২য় পর্ব )
বসন্তের সমারোহ চারদিকে
প্রিয় খুঁজে নিচ্ছে তার প্রেয়সীকে
তোমার চিঠি আসে নি
পোস্টম্যান কাকুটা ভীষণ অলস হয়ে গেছে
কে কাকে চিঠি দিচ্ছে
সেই চিঠির জন্য কারো আকুলতা
কিই বা এসে যায় তাতে তার
দু’দিন পরে পৌঁছালেই হবে
এই ভেবে আর আসে না।
তাই আমিই বসলাম লিখতে

কেমন আছো তুমি?
মনটা খুব উদাস লাগছে
কি জানি কেন?
ময়না দুটোকে ছেড়ে দিয়েছি
বাঁচুক ও দুটিতে নিজের মতো করে
এখন আমার কাজ অনেক কম
ফুলের বাগান ফুলে ফুলে ভরে গেছে
রোজ সকালে ফুল তুলি এক সাঁজি
মালা গাঁথি হাতে নিয়ে বসে থাকি চুপচাপ
ভালো আছো তো তুমি?

এতদিনে কবিতা লিখে
ভর্তি করেছো অনেক খাতা
সব শুনবো তোমার পাশে বসে
গালে হাত দিয়ে
বসন্তের হাওয়ায় অগোছালো চুলে
বিলি কেটে দেব
মুচকি হাসবে তুমি তাকিয়ে আমার দিকে
আমি গেয়ে উঠবো গুনগুন করে

আমার প্রাণের পরে চলে গেল কে
বসন্তের বাতাসটুকুর মতো  
সে ছুঁয়ে গেল নুয়ে গেল রে
ফুল ফুটিয়ে গেল শত শত

দোলে এলে না তুমি
রেল কোম্পানি এখন
ঠিক সময়ে আর ট্রেন চালায় না বুঝি?
আমি পথের দিকে চেয়ে ছিলাম
খুব রাগ হচ্ছিল ট্রেনের উপর
তোমাকে স্টেশন থেকে ফিরে যেতে হয়েছে নিশ্চই
তোমার মনের ব্যাকুলতা
টের পাই আমি
বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে আসবে তো?
তোমার প্রিয় রঙের শাড়ি পরবো আমি
এসো কিন্তুতোমার অপেক্ষায় থাকবো



প্রতিজ্ঞা
মাধবীলতা গাছটা ফুলে ফুলে ছেঁয়ে আছে
বাড়ির সব ঘর গুলোতে
ফুলের সুবাসে ভরে গেছে
গাছটা আকাশের মায়ের হাতে লাগানো,
ঘরের চারদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে সে
প্রতিটি কোণায় ওর মায়ের হাতের স্পর্শ
লেগে আছে
আলমারির তাকে
সব কাপড়ের ভাঁজে ভাঁজে
মায়ের গন্ধ পায় সে।
কোথায় যেন হারিয়ে গেছে ওর মা
সে শুনেছে- মানুষ মরে গেলে
আকাশের তারা হয়ে যায়।
আকাশ তাকিয়ে থাকে এক দৃষ্টিতে
আকাশের দিকে
ওর মাতো মারা যায় নি
কি করে থাকবে তবে আকাশে?

পরিস্কার মনে আছে দু বছর আগে
খুব চেঁচামেচি বাবার সাথে মায়ের
একদিন রাতের বেলা
নোংরা নোংরা কথা বলেছিল বাবা
পরের দিন সকালে,
ভয়ে ভয়ে তাকাল আকাশ
মায়ের দিকে
সব স্বাভাবিক ছন্দেই আছে
কোথাও এতটুকু ছন্দ পতনের আভাস নেই
ওই তো রান্না করছে মা
আদর করে খাইয়ে দাইয়ে
স্কুলে পাঠাল বোঝেনি আকাশ
এই খাওয়াই মায়ের হাতের শেষ খাওয়া
আর মাকে দেখেনি  
ছোট্ট একটা চিরকূট


ফিরব না আমি
কতগুলো দিন পার হয়ে গেছে
এবছর আকাশ মাধ্যমিক দেবে
দিদার বাড়ি থাকে
খুব মনে পড়ছে মায়ের কথা
কোথায় আছে মা? ভাবে আকাশ
বড় হয়ে সে খুঁজে বার করবে মাকে।

একবার ওর মা
বাঁশি কিনে দিয়েছিল মেলা থেকে
আকাশ বাজাতে পারত না
শুধু ফুঁ দিত মুচকি হাসত মা
এখন ওর বাঁশি
কেঁদে কেঁদে মাকে খুঁজে ফেরে
মায়ের মুখের মুচকি হাসিটা
অনেক দিন দেখে নি।

খুব ডাইরী লেখার অভ্যাস ছিল
ওর মায়ের
কৌতুহল আকাশের খুব
কি লেখে মা? দেখতেই হবে
এখন সে ডাইরী আকাশের হাতে
সে তার মাকে নতুন করে আবিষ্কার করছে
ডাইরীর প্রতিটি পাতায় পাতায়
মায়ের এত কষ্ট ছিল?
কই, বুঝতে পারে নি তো! আকাশ
কি করে পারত মা?
এত কষ্ট লুকিয়ে রাখতে
মায়েরা মনে হয় সব পারে।

প্রতি বছর পূজোতে
দুটো নতুন পোশাক বরাদ্দ আকাশের
দাদুর বাড়ি থেকে একটা আসতো,
বাবা দিত আরেকটা
সে বছর বাবার কাজ নেই
পাটকল সবে বন্ধ হয়েছে
ঘরের চারদিকে অভাব
দানা বাঁধতে শুরু করেছে
মন খারাপ আকাশের
একটা জামা পরেই ঘুরতে হবে তাকে
বাবা দিতে পারেনি
অষ্টমীর দিন সকালে,
মা এগিয়ে দিয়েছিল
নতুন জামা প্যান্ট
খুব খুশি হয়েছিল আকাশ সেদিন।
তবে কদিন পরে লক্ষ্য করল,
মায়ের ডান হাতের অনামিকা ফাঁকা
জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই দেখেছে আংটিটা মায়ের আঙ্গুলে
জিজ্ঞেস করেছিল- আংটি কই মা?
মায়ের নির্বিকার উত্তর- খুলে রেখেছি
ওত গুরুত্ব দেয় নি সে
এখন বোঝে সে
ওর একটু খুশির জন্য
কত বড় আত্মত্যাগ করেছিল মা
দাদুর দেয়া আংটি ছিল ওটা।
মনে মনে আরেকবার প্রতিজ্ঞা করে আকাশ
খুঁজে আনবেই সে তার মাকে।


শূন্যতা
(১)
ঘড়িতে এখন রাত সাড়ে আটটা
দক্ষিণের বাতাসে
জানালার পর্দাটা উড়ে এসে
মুখে লাগছে সুখলতার
নিশ্চুপ ভাবে দাঁড়িয়ে আছে সে
জানালার ধারে
চোখ রাস্তার দিকে
ওই দূরের লাইট পোস্টে
টিমটিম করে জ¦লছে বাতি
কিছুক্ষণ আগে, রাত আটটার
ট্রেনটা বেড়িয়ে গেছে
শব্দ পেয়েছে সুখলতা
হয়তোবা ওরা এই ট্রেনেই ফিরবে
বুকের ধুকপুকানিটা হঠাৎ করেই
কেমন বেড়ে গেল
অস্থির হয়ে উঠলো সে।

(২)
সুখলতা বছর চল্লিশের একজন নারী
পূর্ণ বিকাশ হয় নি তার নারীত্বের
নিঃসন্তান সে মাতৃত্বের স্বাদ কেমন
জানতে পারেনি
অবিনাশ তার স্বামী,
চাকরী করে একটি অফিসে
কোনদিন কোন হতাশাজনক কথা নেই
তার মুখে খুবই নিরীহ সে
কিন্তু সুখলতাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল
একটি সন্তান দিতে না পারার যন্ত্রণা

(৩)
প্রতি বছর পূজোতে
ভাইপো ভাইঝিদের জন্য কেনাকাটা হয়
দোকানে ঝোলানো ছোট্ট ছোট্ট জামা
নিজের অজান্তেই
দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে
হয়তো অবিনাশ ও ফেলে
টের পায় নি সে কখনও।

(৪)
মনে পরে সুখলতার বিয়ের প্রথম বছর
মধুচন্দ্রিমায় গিয়েছিল দার্জিলিঙ
পাহাড় ওদের দুজনেরই ভীষণ প্রিয়
সদ্য বিবাহিত জীবন অবিনাশের মতো স্বামী
খুব আনন্দ করেছিল ওরা
দার্জিলিঙের কাঞ্চন জঙ্ঘা পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে
বলেছিল অবিনাশ-
আবার আমরা পাঁচ বছর পরে আসবো
আমাদের ছোট্ট বেবিকে নিয়ে
লজ্জা পেয়েছিল সুখলতা
মন ভরে উঠেছিল অজানা শিহরণে আনন্দে।

(৫)

এরপর পার হয়ে গেছে অনেক গুলো বছর
অন্য অনেক জায়গায় গেছে ওরা
অবিনাশ আর কোনদিন বলেনি
দার্জিলিঙে যাওয়ার কথা
ওদের ভালোবাসায় কোন খামতি ছিল না
তবুও তবুও কোথাও যেন একটা শূন্যতা।

(৬)
অন্যদিনের মতই ছিল আজকের সকালটা
ঘুম থেকে উঠে স্নান-খাওয়া সেরে
ব্যাগে টিফিন কৌটা ভরে মুখে মৌরি দিয়ে
লম্বা লম্বা পা ফেলে চলে গেল অবিনাশ
স্টেশনের দিকে
প্রতিদিন ভোরের সেকেন্ড ট্রেন টা ধরে সে
সুখলতা অবিনাশের যাওয়া আসার পথের দিকে
রোজ তাকিয়ে থাকে।
আজ সকালেও তাকিয়ে ছিল
সব কিছু তো একই ছিল!
গলির মোড়ের চায়ের দোকানটায়
এই সময় আঁচ পরে গলগল করে ধোঁয়া ওঠে
আজও উঠেছিল
একদল কাক কা কা করে ডাকছে
প্রতিদিনের মতো মিত্র বাড়ির ছাদে বসে
রাস্তার কলে জল এসে যায় ততক্ষণে
একজন, দুজন করে বালতি নিয়ে এগিয়ে আসে
আজও এসেছিল
কোনও ব্যতিক্রম কিছুই চোখে পরে নি
সুখলতার তাহলে সে যেতে দিত না
অবিনাশ কে তার স্বামী কে

(৭)
বিকেলের দিকে একটা ফোন এল
তার জীবন টা এক ঝটকায় এলোমেলো হয়ে গেল
তখন থেকেই ঠাঁয় দাঁড়িয়ে
জানালার সামনে
বাড়ির অন্যান্যরা খবর পাওয়া মাত্র
ছুটে গেছে কোলকাতায়
প্রতিদিন রাত আটটার ট্রেনে ফেরে অবিনাশ
আজও ফিরবে
লোকজনের কথা বার্তার আওয়াজ ভেসে আসছে
হঠাৎ নজরে পরে
ফুল দিয়ে সু সজ্জিত একটি গাড়ি
এবার বুঝতে পারলো কেন দেরী হচ্ছিল আসতে
অবিনাশ কে সাজানো হচ্ছিল।

(৮)
মনে পরে গেল সুখলতার বিয়ের দিনের কথা
প্রচুর ফুল দিয়ে সাজানো একটি গাড়ি থেকে
নেমেছিল অবিনাশ
গলায় ফুলের মালা কপালে চন্দন
লুকিয়ে দেখেছিল সুখলতা
মুখে ছিল সেদিন তার লাজুক হাসি চোখে স্বপ্ন

(৯)
আজকেও এসেছে অবিনাশ
ফুল দিয়ে সাজানো একটি গাড়িতে
গলায় ফুলের মালা
কপালে চন্দন
এত বছর পরেও সুখলতা দেখছেলুকিয়ে
জানালার ফাঁক দিয়ে

(১০)
এই প্রথম চিৎকার করে কেঁদে উঠলো সুখলতা
চোখের জল আর কোন বাঁধ মানলো না।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
কপিরাইট © 2018-12-11 এফএনএস২৪.কম কর্তৃক সর্ব স্বত্ব ® সংরক্ষিত।