fairnews24 Logo

আলতাব সুবেদার এক জীবন্ত কিংবদন্তী

এফএনএস (মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান; পীরগঞ্জ, রংপুর) : | 16 Apr 2018   05:18:06 PM   Monday
 আলতাব সুবেদার এক জীবন্ত কিংবদন্তী

 “আলতাব সুবেদার”রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলা ও পার্শ্ববর্তী গাইবান্ধা জেলার সাদুল্যাপুর উপজেলা বাসীর কাছে এক জীবন্ত কিংবদন্তী। স্বাধীনতা যুদ্ধে এই এলাকার নারী পুরুষ নির্বিশেষে আবার বৃদ্ধ বনিতা সকলে তাঁর দুঃসাহসিক যুদ্ধ পরিচালনা প্রত্যক্ষ করেছেন। এই এলাকার মানুষের মনের মণি কোঠায় তাই তিনি বিশেষ স্থান করে নিয়েছেন। সৈয়দপুর ক্যান্টমেন্টে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সুবেদার পদে কর্মরত থাকাকালীন ২৫ শে মার্চের কালো রাত্রীর পুর্ব রাতে বাঙ্গালী সেনারা বিদ্রোহ ঘোষনা করে পাকসেনাদের সাথে সেখানেই যুদ্ধে লিপ্ত হন। সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে মাঝে একটি মাত্র পুকুরের ব্যবধান দু’দলের মধ্যে উভয় পক্ষে মুহুর্মুহু গুলি বিনিময় হচ্ছে। অবস্থা বেগতিক দেখে প্রাণভয়ে পাকসেনারা ক্যান্টনমেন্টের তারকাঁটার বেড়া ডিঙ্গিয়ে পালিয়ে যেতে থাকলে বাঙ্গালীদের গুলিতে বিদ্ধ হয়ে সেখানেই ঝুলে থাকে তাদের লাশ। এরপর হালকা ও ভারী সবগুলো অস্ত্র নিয়ে ফুল বাড়ি উপজেলার দিকে রওয়ানা হন আলতাব সুবেদার। সাথে ৭০/৭২ জন বাঙ্গালী সেনা। যারা একসময় পাকসেনা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ফুলবাড়ি থেকে ঘোড়াঘাট হয়ে পলাশবাড়ি। এরপর পীরগঞ্জ। এলাকার শত শত লোকজনকে সাথে নিয়ে পীরগঞ্জের ঐতিহাসিক আংরার ব্রীজ ভেঙ্গে দিয়ে মাদারগঞ্জে গিয়ে অবস্থান নেন। এরপর যুদ্ধ শুরু হয় ভোর ৫ টায়। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মাদারগঞ্জ-মীরপুর প্রতিরোধ যুদ্ধের নেতৃত্ব দানকারী আলতাব সুবেদার। তৎকালীন থ্রী ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সুবেদার পরবর্তীতে অনারারী ক্যাপ্টেন (অবঃ) বীর উত্তম বীর প্রতীক আফতাব আলী এক সাক্ষাতকারে স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে তার যুদ্ধকালীন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন-আমরা ২৪ মার্চ ১৯৭১ সালে সৈযদপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হয়ে এসে ফুলবাড়িতে অবস্থান নেই। সেখান থেকে দিনাজপুর পরবর্তীতে ঘোড়াঘাট হয়ে পীরগঞ্জে। আমরা ওই দলে ৭০/৮০জন ছিলাম। আমাদের ধারণা ছিল রংপুর ক্যান্টেনমেন্ট থেকে সেনাবাহিনী মাদারগঞ্জ এবং পীরগঞ্জের আংরার ব্রীজ দিয়ে যেতে পারে। সে কারণে ১৫ই এপ্রিল আমরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে আংরার ব্রীজে এবং মাদারগঞ্জে অবস্থান নেই। নির্দেশ দেয়া ছিল সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য আংরার ব্রীজ ভেঙ্গে ফেলার। সে মোতাবেক আংরার ব্রীজে অবস্থান নেয়া দলটি ব্রীজ ভাঙ্গার কাজ শেষ পর্যায়ে এলে ১৬ই এপ্রিল হানাদার বাহিনীর একটি সুসজ্জিত দলের সাথে তাদের মুখোমুখি যুদ্ধ হয়। সেখানে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর একটি এলএমজি ও একটি সেনাবাহিনী অফিসারের ব্যবহৃত একটি জিপগাড়ী ফেলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এ যুদ্ধের পরপরই রংপুর ক্যান্টেনমেন্ট থেকে সেনাবাহিনীর একটি দল হেটে রওনা দিয়ে ১৭ এপ্রিল ভোর রাতে মাদারগঞ্জের হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় ঘরবাড়ীতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং লুটপাট চালাতে থাকে। এ সময় আমরা এগিয়ে এলে পাকহানাদার বাহিনীর সাথে ১৭ই এপ্রিল ভোর ৫টায় মাদারগঞ্জে আমার জীবনের সবচাইতে বড় মুখোমুখি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এখানে আমার গুলিতে কমপক্ষে ৪ জন পাকিস্তান সেনা নিহত হয় এবং পরে তারা এখান থেকে ছত্রভঙ্গ হয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়। এখানে আমাদের ২জন সহযোদ্ধা শহীদ হন। অইদিন সন্ধ্যায় আমরা গাইবান্ধায় বি,এড কলেজে পৌছি। সেখান থেকে রাত ৩টায় সানন্দবাড়ী চরে (জামালপুর জেলা) চর ঘুরে কুত্তিমারী (রাজিবপুর উপজেলা) সেলিম চেয়ারম্যানের বাড়ীতে ৪দিন পর পৌছি। সেদিন পর্যন্ত আমরা সকলে টানা ৪দিন ধরে অনাহারে। শুধুমাত্র পানি ছিল একমাত্র খাদ্য। আমরা সেলিম চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করলে তিনি এই ৭০ জনের দলটিকে পান্তাভাত খাওয়ান। সেখানেই খবর পাই রৌমারী থানায় পাঞ্জাবীরা অবস্থান নিয়েছে। আমরা রৌমারী থানা সবদিক থেকেই ঘিরে ফেলে আমি মাথায় পাকিস্তানী পতাকা বেঁধে থানায় প্রবেশ করি। এখানে আমার সেনাবাহিনীর পোশাক পরনে থাকায় এবং মাথায় পাকিস্তানী পতাকা থাকায় তারা আমার কৌশল প্রথমে বুঝতে পারেনি। আমি ভিতরে ঢুকেই সবাইকে লাইনে দাঁড় করাই এবং নিরস্ত্র  করে ফেলি। এরপর রৌমারী থানার ওসি’র রিভলবার কেড়ে নিয়ে তাকেও জিম্মি করি। ঠিক সে সময় ৪ দিক থেকে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা দৌড়ে এসে সব অস্ত্র আমাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় এবং ৭জন পাঞ্জাবী সেনাকে প্রাচীর উপর লাইন করে তাদেরকে ব্রাশ ফায়ারে হত্যার পর কোনরুপ জানাজা ছাড়াই মাটি চাপা দেয়া হয়। এরপর সানন্দবাড়ীতে ট্রেনিং সেন্টার খুলে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দেই এবং সেখান থেকে গিয়ে বিভিন্ন জায়গায় গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। যুদ্ধকালীন সময়ে সবচাইতে লোমহর্ষক ঘটনার বর্ননা করতে গিয়ে তিনি বলেন-রৌমারী উপজেলার এক কাশবনে আমাদের চারিদিকে পাকসেনারা ঘিরে ফেলে। এ অবস্থায় আমি কৌশলের আশ্রয় নিয়ে একটিমাত্র ফায়ার করতেই তারা বিরতিহীন ফায়ার শুরু করে। এ অবস্থায় খোলা পথ আবিষ্কার করে সেই পথেই বের হয়ে যাই। আলতাব সুবেদার সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলার মোকাম বাজার গ্রামের মৃত ইদ্রিস আলীর পুত্র। তিনি ২ আগস্ট ১৯৭৯ইং তারিখে চট্টগ্রাম ২৪ ইনফেনটি ডিভিশন থেকে অবসর গ্রহণ করেন। বর্তমানে সপরিবারে কানাডা প্রবাসী। স্বাধীনতা যুদ্ধের দীর্ঘ ৪০ বছর পর একবার মাত্র পীরগঞ্জে এসেছিলেন। এই অঞ্চলকে সবচেয়ে জনপ্রিয় এই আফতাব আলী সুবেদার। যিনি এই এলাকায় সাধারন মানুষের কাছে আলতাব সুবেদার হিসেবে পরিচিত। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় সকল প্রতিরোধ যুদ্ধ তারই নেতৃত্বেই সংঘটিত হয়েছে। তাই তিনি এই এলাকার জনমানুষের কাছে এক জীবন্ত কীংবদন্তী !

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
কপিরাইট © 2018-09-19 এফএনএস২৪.কম কর্তৃক সর্ব স্বত্ব ® সংরক্ষিত।