সৌন্দর্য হারাচ্ছে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত , অবৈধ উৎকোচে বৈধতা পায় হকাররা

এফএনএস (বলরাম দাশ অনুপম; কক্সবাজার) : | প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর, ২০২৫, ১২:৪০ পিএম
সৌন্দর্য হারাচ্ছে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত , অবৈধ উৎকোচে বৈধতা পায় হকাররা

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার। প্রতিদিন কয়েক হাজার পর্যটক ছাড়াও বিশেষ দিনগুলোতে প্রায় লক্ষাধিক ছুঁয়ে যায়। পর্যটকের উপস্থিতিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে পাঁচ শতাধিকের অধিক হোটেল। যেখানে রাত্রি যাপনের সুযোগ হয় প্রায় ৮০ হাজার পর্যটকের। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সৈকতের প্রতিটি পয়েন্ট পর্যটকে ঠাঁসা থাকে। বালিয়াড়ি, সাগরের নোনাজলসহ বিভিন্ন রাইডে চড়ে দারুণ সময় পার করেন পর্যটকরা। তাদের আনন্দের সাথে আবার হতাশাও দেখা দিয়েছে। 

গাজীপুর থেকে আসা সানজিদা - মনির দম্পত্তি বলেন, বৃহস্পতিবার সকাল ৭ টার দিকে কক্সবাজার পৌঁছেছি। কলাতলীর একটি হোটেলে উঠেছি। বিকেলে সুগন্ধা বিচে যাওয়ার উদ্দেশ্য বের হই।  কিন্তু, মেইন পয়েন্টে এসে আর রাস্তা খুঁজে পায় না। প্রবেশের দু'পাশে ভাসমান দোকান এবং মাঝখানে টমটম ও রিকশা। কোনমতে বালিয়াড়ি হয়ে কিটকটে বসলাম। ৪০ মিনিট বসে চলে যেতে হলো। ডিম, চানাচুর, পানি, চিপস, বাদাম, গা- মালিশসহ আর-ও কত কি দেখলাম। 

চট্টগ্রামের হালি শহর থেকে আসা জনি বলেন, শুক্রবার বিকেলে সুগন্ধা আবাসিকের একটি হোটেলে ১৪ জন বন্ধু চার'টি রুম বুকিং করি। দুপুরের পরে সুগন্ধা বীচে গোসলের উদ্দেশ্য বের হয়ে হকারদের খপ্পরে পড়ে যায়। পুঁথির একটি মালা ৭০ টাকা দিয়ে কিনলাম। কিন্তু সেইম মালা পাশে বিক্রি করছে ৫০ টাকা। আমরা কয়েকজন ত্রি-কোয়াটার প্যান্ট কিনলাম ২০০ টাকা করে। বীচে নামতে গিয়ে আর পথ খুঁজে পায়না। রিকশা ও টমটমের দখলে প্রবেশ পথ। ক্ষোভ প্রকাশ করে তাঁদের দলে থাকা প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির ছাত্র ( আইন বিভাগ) রাফসান রবিন বলেন, সময় পেলেই বন্ধুরা মিলে কক্সবাজার চলে আসি। কিন্তু, এত সুন্দর একটি পর্যটন এলাকায় যেন কোন অভিভাবক নেই। যে যার মত করে ফুটপাত সড়ক দখল করে দিব্যি ব্যবসা করছে। কোথায় পার্কিং, কোথায় শৃঙ্খলা কিছুই'তো দেখলাম না। 

আলির জাহাল এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা আতিকুল ইসলাম বলেন, সময় পেলে সৈকতে হাঁটার জন্য বের হই। কলাতলী থেকে হেঁটে সুগন্ধা বীচ এসে দাঁড়ায়। কিন্তু, সৈকতের সৌন্দর্য দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ভাসমান হকার, যত্রতত্র পার্কিং এবং ছোট ছোট শিশুদের উৎপাতে সৈকতে আসাও মুশকিল হয়ে পড়েছে। কোন নিয়ম শৃঙ্খলা যেন নেই সৈকতে। 

সরেজিমনে গিয়ে দেখা যায়, কলাতলী প্রধান সড়ক থেকে সুগন্ধা পয়েন্ট ঢ়ুকতে দু'পাশে চারটি দোকানের সারি সারি লাইন। যেখানে -ফিস ফ্রাই, ঝিনুক, বিরিয়ানি, মালাই চা, কাপড়ের দোকান, ডাব, ডিমের দোকানসহ প্রায় ৩০০-৩৫০ টি ভাসমান দোকান চোখে পড়ে। পথচারীদের হাঁটার ফুটপাত নেই বললে চলে। এক মিনিট হেঁটে গেলাম টুরিস্ট পুলিশের বক্সের সামনে। উত্তর এবং দক্ষিণে একশো গজের মধ্যে টমটম এবং রিকশা ( ব্যাটারিচালিত) অন্তত ৫০ টি। দক্ষিণে কড়াই রেষ্টুরেন্ট'র সামনে ৪০ ফুট সড়কের মধ্যে রয়েছে মাত্র ১০ ফুট। তিনটি ডাবের দোকান, ঝিনুক, আইসক্রিমসহ আরও কয়েকটি ভাসমান দোকান। অনেকটা গাদাগাদি অবস্থায় সৈকতে নামছে পর্যটকরা। টুরিস্ট পুলিশ বক্সের দক্ষিণে নামতে দু'টি চশমার দোকান, খেলনাসহ বিভিন্ন প্রকারের দোকান। মাঝখানে কিছুটা ফাঁকা থাকলে-ও বালিয়াড়ির ৮০ শতাংশ দখলে নিয়েছে ভাসমান হকাররা। সড়ক থেকে বীচ পর্যন্ত দুইশো গজের মধ্যে অন্তত শতাধিক দোকান বসেছে। পর্যটকরা বীচ পর্যন্ত সুন্দর করে হেঁটে যাবে সেই পরিস্থিতি সুগন্ধা বীচে নেই। এবার একটু সুগন্ধা চৌমুহনী থেকে একটু উত্তরে চোখ পড়ে। জেলা প্রশাসনের তথ্য কেন্দ্র থেকে শুরু করে লাবনী কাসুন্দি রেস্তোরাঁ পর্যন্ত ৯৬টি দোকান বসেছে। বেশিরভাগ দোকান সড়কের পশ্চিম পাশে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকরা অনেকটা হতাশ বললেই চলে। পর্যটন নগরীর সবচেয়ে বেশি বিশৃঙ্খলা চোখে পড়ছে সুগন্ধা বীচে। এছাড়া কিটকটে বসা পর্যটকেরা আর-ও বেকায়দায় আছেন। ডিম, পানি, বাদাম, গা-মালিশ, চিপস, টক-ঝাল-মিষ্টি আচার, আনারকলি, আমড়াসহ হরেক-রকমের খাবার নিয়ে তাদের বিরক্ত করছেন 

ভাসমান হকাররা। অনেকেই বাধ্য হয়ে সময় থাকা সত্বেও কিটকট থেকে সরে পড়েন 

অভিযোগ পাওয়া গেছে, শুধু সুগন্ধা চৌমুহনী ঘিরে গড়ে উঠা ৫ শতাধিক দোকান থেকে দৈনিক দুই শিফটে টাকা তোলা হয়। টাকার বিনিময়ে বৈধতা পেয়ে যাচ্ছে হকাররা। বৈধ দোকানদার থেকে অবৈধ এসব ব্যবসায়ীর দাপট দ্বিগুণ। তাদের একটি সিন্ডিকেটও রয়েছে। পজিশন অনুযায়ী নতুন দোকান বসিয়ে দিতে এককালীন মোটা অংকের টাকাও দিতে হয়। সবমিলিয়ে সুগন্ধা পয়েন্টর যেন হ য ব র ল অবস্থা। অভিভাবকহীন, এই পয়েন্টটি পর্যটকের পছন্দের তালিকায় থাকলে-ও শৃঙ্খলা না থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে চলে যাচ্ছেন কলাতলী হয়েল মেরিন ড্রাইভ সড়কের দিকে। 

সুগন্ধা বীচের একাধিক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, বছরে লাখ টাকা দিয়ে বাৎসরিক দোকান ভাড়া নিয়েছেন তারা। লক্ষ লক্ষ টাকার মালামাল দোকানে তুলেছেন। এখন ভাসমান দোকানীদের কারণে তাদের আশানুরূপ ব্যবসা হয়না। তারা দৈনিক দুই শিফটে টাকা দিয়ে দোকান বসিয়েছে। সড়কের মাঝখানে, ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করছে। মাঝেমধ্যে অভিযান চললেও তা যেন লোক দেখানো। 

নাম জানাতে অনিচ্ছুক ঝিনুক ব্যবসায়ী সমিতির একজন সদস্য বলেন, একটা সময় সুগন্ধা বীচে পর্যটক নামার একটা সুন্দর ব্যবস্থা ছিল। এখন সৈকতে প্রবেশের পথ বন্ধ বললেই চলে। এখানে বীচ কর্মীরা রয়েছে, তাদের দায়িত্ব কি ?  তাদের চোখের সামনে এই বিশৃঙ্খলা চলছে। যেখানে সেখানে দোকান বসাই দিচ্ছে। 

সুগন্ধা ঝিনুক ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি জয়নাল আবেদিন জানান, হকারদের সাথে আমার প্রতিনিয়ত ঝগড়া লেগেই থাকে। ভাসমান দোকান বসানোর জন্য কারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে লিখেন। কাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে তারা সড়ক এবং ফুটপাত দখল দখল করে ? এ ব্যাপারে প্রায় সময় পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে কথা হয়। তিনি অভিযান চালানোর আধা ঘণ্টা কিংবা এক ঘন্টার মধ্যেই ফের বসে যায়। সুগন্ধা পয়েন্ট পর্যটকদের তালিকায় প্রথম সারিতে থাকলেও হকারদের উৎপাতে এখন অতিষ্ঠ পর্যটকেরা।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে