তরুণদের সামাজিক উদ্যোগ প্রকল্পের আওতায় “সংঘাত নয়, শান্তি ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ি”শ্লোগানকে সামনে রেখে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার কাইতকোনা হাজং পল্লীতে প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হয়েছে “সম্প্রীতির দেউলী উৎসব”। বুধবার দিনব্যাপী এ উৎসবের আয়োজন করে বিশ্বম্ভরপুর ইয়থ পিস এম্বাসেডর গ্রুপ।
হাজং সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী দেউলী পৌষ উৎসবকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এ উৎসবের মূল লক্ষ্য ছিল বিলুপ্তপ্রায় এই লোকজ উৎসবকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচিত করা এবং হাজং জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক চেতনা জাগ্রত করা।
উৎসবের উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ টেলিভিশনের নিয়মিত শিল্পী চন্দনা হাজং। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বম্ভরপুর ইয়থ পিস এম্বাসেডর গ্রুপের সমন্বয়কারী কুহিনুরের সভাপতিত্বে এবং সামছুল কবিরের সঞ্চালনায় আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন চন্দনা হাজং।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বম্ভরপুর পিস ফ্যাসিলিটেটর গ্রুপের পিস এম্বাসেডর সিরাজ খন্দকার, সমন্বয়কারী ফুলমালা, সুনামগঞ্জ সদর পিএফজির পিস এম্বাসেডর সিরাজুল ইসলাম পলাশ, পিএফজি সদস্য নুরুল হাসান আতাহের, মছিহুর রহমান রাসেল ও কর্ণবাবু দাস। স্বাগত বক্তব্য রাখেন দি হাঙ্গার প্রজেক্টের কুদরত পাশা।
বক্তারা বলেন, হাজং সম্প্রদায় একটি ঐতিহ্যপ্রিয় ও সংস্কৃতিমনা জনগোষ্ঠী। তাদের কৃষিভিত্তিক ও ধর্মীয় বহু উৎসব আজ বিলুপ্তির পথে। দেউলী পৌষ উৎসব হাজং সম্প্রদায়ের অন্যতম বর্ণিল ও জীবনঘনিষ্ঠ উৎসব হলেও দীর্ঘদিন ধরে তা আয়োজনের বাইরে ছিল। প্রথমবারের মতো এ উৎসব আয়োজন হওয়ায় সকাল থেকেই হাজং পল্লীতে আনন্দ ও উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে।
আয়োজকেরা জানান, এই আয়োজনের মাধ্যমে হাজং জনগোষ্ঠী যেন নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয়, ঐতিহ্য ও কৃষ্টির প্রতি আরও সচেতন হয় এবং গর্ববোধ করে-সেই লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আধুনিকায়নের চাপে অনেক লোকজ উৎসব হারিয়ে গেলেও দেউলীর মতো প্রাচীন উৎসবের পুনরুজ্জীবন হাজং সংস্কৃতিকে নতুন করে শক্তিশালী করবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
আলোচনা সভা শেষে শুরু হয় হাজং সম্প্রদায়ের মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে আমলা হাজং গাঁও নৃত্য পরিবেশন করেন শ্রদ্ধা ও তার দল। আফছা আফচা সন্ধ্যানী নৃত্য পরিবেশন করেন অঙ্কিতা ও তার দল। সুস্পা ও তার দল পরিবেশন করেন লিওয়াটানা নৃত্য। কাশিপুর গ্রামের নন্দিনী ও তার দল পরিবেশন করেন আহিসে বৈশাখী নৃত্য। এছাড়া মুগ্ধ, শ্রদ্ধা, বৈশালী, অসীম ও প্রকৃতি একের পর এক নৃত্য পরিবেশন করে দর্শকদের মুগ্ধ করেন।
বিভিন্ন গ্রাম থেকে আগত হাজং শিল্পীরা নৃত্য ও সংগীতের মাধ্যমে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী কৃষ্টি তুলে ধরেন। অনুষ্ঠান শেষে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত হয়।
আয়োজকেরা বলেন, দেউলী পৌষ উৎসবকে কেন্দ্র করে হাজং সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রসারে এই উদ্যোগ সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আরও সুদৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তারা শান্তি ও সম্প্রীতির বিশ্বম্ভরপুর গড়ার যে স্বপ্ন নিয়ে কাজ করছেন, এই আয়োজন তারই একটি অংশ।