এক আবেগঘন মুহূর্তের সাক্ষী হলো লালপুরের তিলকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

এফএনএস (এ.কে. আজাদ সেন্টু; লালপুর, নাটোর) : | প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর, ২০২৫, ০৭:২২ পিএম
এক আবেগঘন মুহূর্তের সাক্ষী হলো লালপুরের তিলকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

সময় বদলায়, প্রজন্ম বদলায়- তবু কিছু প্রাঙ্গণ থাকে, যেখানে পা রাখলেই শৈশব ফিরে আসে। এমনই এক আবেগঘন মুহূর্তের সাক্ষী হলো নাটোরের লালপুর উপজেলার তিলকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। শত বছরের পথচলার গৌরব নিয়ে বিদ্যালয়টি উদযাপন করল তার শতবর্ষ পূর্তি- প্রবীণ ও নবীনের মিলনমেলায় পরিণত হলো চেনা সেই প্রাঙ্গণ।

‘স্মৃতির টানে প্রিয় প্রাঙ্গণে, এসো মিলি প্রাণের বন্ধন" - এই হৃদয়ছোঁয়া স্লোগানকে সামনে রেখে বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর ২০২৫) দিনব্যাপী বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত হয় বর্ণাঢ্য শতবর্ষ উৎসব। একদিনের আয়োজনে যেন ফিরে এলো শত বছরের গল্প, হাসি-কান্না, সাফল্য আর স্মৃতির সুবাস।

ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে সকাল ৭টায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ও গীতাপাঠের মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। এরপর জাতীয় পতাকা উত্তোলন, জাতীয় সংগীত পরিবেশন এবং প্রয়াত প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া- সব মিলিয়ে আবেগঘন এক সূচনা।

শত বছরের গৌরবময় ইতিহাসকে তুলে ধরতে আয়োজন করা হয় বর্ণাঢ্য র‍্যালি, কুইজ প্রতিযোগিতা, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রথম পর্বে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে শোভাযাত্রা, পরিচয় পর্ব ও স্মৃতিচারণে বারবার ফিরে আসে শৈশবের স্কুলঘণ্টা, খেলার মাঠ আর বেঞ্চে বসে দেখা স্বপ্নের গল্প। পাশাপাশি বর্তমানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় প্রাণচাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে পুরো প্রাঙ্গণে।

বিকেলে শতবর্ষ উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকার মোড়ক উন্মোচনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দ্বিতীয় পর্বের আনুষ্ঠানিকতা। মোড়ক উন্মোচন করেন লালপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. জুলহাস হোসেন সৌরভ।

শতবর্ষ পূর্তি উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক গোলাম কিবরিয়া চৌধুরী স্বাগত বক্তব্যে বলেন, “শিক্ষা একটি জাতির আত্মপরিচয়ের মূল স্তম্ভ। সেই ভিত্তিকে সুদৃঢ় করতে তিলকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শত বছর ধরে নিরলসভাবে আলোর পথ দেখিয়ে চলেছে।” তিনি এই মহতী আয়োজনে অংশগ্রহণকারী সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

শতবর্ষ উদযাপন কমিটির সম্পাদক মো. শাহজাহান আলীর সঞ্চালনায় এবং আহ্বায়ক গোলাম কিবরিয়া চৌধুরীর সভাপতিত্বে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইউএনও মো. জুলহাস হোসেন সৌরভ বলেন, “১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই বিদ্যালয়টি এ অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে অনন্য ভূমিকা রেখে চলেছে।” অনুষ্ঠানে আবেগে আপ্লুত হয়ে স্মৃতিচারণ করেন ১৯৬৫ সালে পঞ্চম শ্রেণী পাস করা শিক্ষার্থী মো. নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, “বিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপন আমাকে আবার আমার শৈশবে ফিরিয়ে নিয়েছে। আমার অনেক সাথী আজ আর নেই- এই প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে তাদের কথা খুব মনে পড়ছে।”

১৯৭৮ সালে বিদ্যালয়ের প্রথম বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী অঞ্জন কুমার কুন্ডু সম্মাননা পেয়ে আনন্দ প্রকাশ করে বলেন, “এই শতবর্ষ পূর্তি অনুষ্ঠান আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি হয়ে থাকবে।” ২০১৭ সালের বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী তাসফিয়া তাবাসসুম রিংকি বলেন, “প্রবীণ ও নবীনের এই মিলনমেলা আমাকে নতুন করে অনুপ্রাণিত করেছে।”

অনুষ্ঠানে সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন ভেড়ামারা পল্লী বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী (অব.) আবু বকর সিদ্দিক, রাজশাহী নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক কামরুজ্জামান গোপন, আমেরিকা প্রবাসী মো. আশরাফুল ইসলাম, নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির প্রধান প্রকৌশলী মো. রবিউল আওয়াল, গোপালপুর ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মোছা. আতিকা বানু, সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. মিজু আহমেদসহ বিভিন্ন পর্যায়ের বিশিষ্টজন।

বক্তারা তিলকপুর গ্রামের কৃতী সন্তানদের শিক্ষা, প্রশাসন, চিকিৎসা, প্রকৌশল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অর্জিত সাফল্যের কথা নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরেন।

প্রধান শিক্ষক তাসলিমা খাতুন জানান, তিলকপুর গ্রামে অবস্থিত এই বিদ্যালয়টি পূর্বে ‘চামটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ নামে পরিচিত ছিল। স্থানীয় জনগণের আবেগ ও পরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০২১ সালে বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘তিলকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। শত বছরের পথচলায় গড়া এই প্রাঙ্গণ যেন ভবিষ্যতেও আলোকিত করে নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন-এমন প্রত্যাশাই নিয়ে শতবর্ষের মিলনমেলার সমাপ্তি ঘটে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে