বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং প্রতিদিনের জীবনের এক ভয়াবহ বাস্তবতা। প্রতিদিনের সংবাদে নতুন নতুন দুর্ঘটনার খবর যুক্ত হচ্ছে, আর সংখ্যার হিসেবে তা এক ভয়ঙ্কর চিত্র এঁকে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনা এখন কেবল একটি পরিবহন সমস্যা নয়, বরং জাতীয় জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার সংকটে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত এক যুগে দেশে প্রায় ৬৯ হাজারের বেশি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ এবং আহত হয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার মানুষ। সংগঠনটির দাবি, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন বা ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে যত মানুষ মারা গেছে, তার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি প্রাণহানি ঘটেছে বাংলাদেশের সড়কে। সংগঠনটির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী অভিযোগ করেন, সড়ক পরিবহন খাতে সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতি, মালিক-শ্রমিকদের চাঁদাবাজি ও নৈরাজ্য, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের অবাধ চলাচল, লাইসেন্সবিহীন ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক, সড়কের ত্রুটি, মাদকাসক্ত চালক এবং বেপরোয়া গতি- এসব কারণেই এত হতাহতের ঘটনা ঘটছে। তাদের মতে, স্বাধীনতার পর থেকে দাতা সংস্থার ‘প্রেসক্রিপশন’ মেনে একের পর এক সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের নামে হয়েছে বেহিসেবি লুটপাট। নৌ ও রেল যোগাযোগের বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে না তুলে নতুন সড়ক নির্মাণের মাধ্যমে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ যাতায়াত সড়কনির্ভর করে তোলায় দুর্ঘটনাও বেড়েছে প্রায় একই হারে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৪০ হাজার মানুষ এবং আহত হয়েছেন আরও ৬০ হাজারের বেশি। নিহতদের মধ্যে নারী, শিশু ও শিক্ষার্থী রয়েছেন প্রায় ১৬ হাজারের বেশি, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৪০ শতাংশ। বছরভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০ সালে নিহত হয়েছেন ৫ হাজার ৪৩১ জন, ২০২১ সালে ৬ হাজার ২৮৪ জন, ২০২২ সালে ৭ হাজার ৭২৩ জন, ২০২৩ সালে ৬ হাজার ৫২৪ জন, ২০২৪ সালে ৭ হাজার ২৯৪ জন এবং ২০২৫ সালে নিহত হয়েছেন প্রায় ৬ হাজার ৮০০ জন। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়- প্রায় ১২ হাজার ৫০০ জন, যা মোট মৃত্যুর ৩৫ শতাংশের বেশি। পথচারী নিহত হয়েছেন প্রায় ৮ হাজার জন, আর থ্রি-হুইলার দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৬ হাজার জন। নারী নিহত হয়েছেন প্রায় ৫ হাজার জন, শিশু প্রায় ৫ হাজার ২০০ জন এবং শিক্ষার্থী প্রায় ৪ হাজার ৯০০ জন। সময়ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে সকালে, যখন স্কুল ও অফিসগামী মানুষের চাপ থাকে। এই সময়ে মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৩০ শতাংশ ঘটে। বিকাল ও রাতের দুর্ঘটনার হারও উল্লেখযোগ্য। আঞ্চলিক সড়কেই সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে, এরপর জাতীয় মহাসড়ক। রাজধানী ঢাকায় গত ছয় বছরে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ২০০ জন। এর মধ্যে ৪২ শতাংশ পথচারী, ৩৯ শতাংশ মোটরসাইকেলচালক এবং বাকিরা বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী। শহরে রাত ও ভোরে দুর্ঘটনার হার বেশি, কারণ তখন ভারী যানবাহনগুলো বেপরোয়া চলে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, দেশে এখনও সমন্বিত পরিবহন কৌশল গড়ে ওঠেনি। ফলে পরিবহন খাতে বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম ও জবাবদিহির অভাব তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, এত প্রাণহানির পরও সংশ্লিষ্ট সংস্থার কারও জবাবদিহি নেই। আইনের শাসনের অনুপস্থিতি ও প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতাই দুর্ঘটনা রোধের বড় বাধা। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা কখনোই এমনি এমনি ঘটে না। এর পেছনে থাকে কারিগরি ব্যর্থতা- যানবাহনের ত্রুটি, রাস্তার নকশাগত সমস্যা, আইন প্রয়োগের ঘাটতি এবং চালক-পথচারীর অজ্ঞতা। এগুলো সমাধান না করে শুধু সুপারিশে সীমাবদ্ধ থাকলে দুর্ঘটনা কমবে না। পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইস এম শাহাদাত হোসাইন জানান, সড়ক নিরাপত্তা একটি সমন্বিত বিষয়। শুধু পুলিশ নয়, স্থানীয় সরকার, রোডস অ্যান্ড হাইওয়ে বিভাগ, ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি এবং অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বিত কর্মসূচি চালানো হচ্ছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতি জরুরিভিত্তিতে ১২ দফা সুপারিশ দিয়েছে- এর মধ্যে রয়েছে নৌ ও রেলপথকে সড়কের সাথে সমন্বয় করে সমন্বিত যাতায়াত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, চাঁদাবাজি ও অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে পরিবহনখাত সংস্কার, প্রতিটি বিভাগীয় শহরে সরকারি উদ্যোগে পাতাল মেট্রোরেল ও বাস র্যাপিড ট্রানজিট চালু, জেলা থেকে উপজেলায় শক্তিশালী বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা আমদানি ও বিপণন বন্ধ, রাষ্ট্রীয় খরচে চালকদের প্রশিক্ষণ ও ট্রাফিক ট্রেনিং একাডেমি স্থাপন, ট্রাফিক পুলিশের কার্যক্রম ডিজিটাল করা, সড়ক দুর্ঘটনার মামলা সরকারি উদ্যোগে আমলে নেওয়া ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা, যাত্রী প্রতিনিধি ও ভুক্তভোগীর মতামত নীতিনির্ধারণে অন্তর্ভুক্ত করা, সড়ক খাতে আইনের সুশাসন ও সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সারাদেশে সাইক্লিস্ট ও পথচারীদের জন্য পৃথক লেন ও নিরাপদ ফুটপাত তৈরি। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা এখন শুধু একটি পরিবহন সমস্যা নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের সংকট। এক যুগে লাখো প্রাণহানি প্রমাণ করে, অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট নয়- প্রয়োজন সমন্বিত কৌশল, জবাবদিহি এবং বাস্তবায়নের আন্তরিকতা। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী বছরগুলোতে এই মৃত্যুমিছিল আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।