দেশে ডিজিটাল লেনদেনের পরিসর সমপ্রতি বিস্তৃত হলেও দেশের অর্থনীতিতে নগদ টাকার ব্যবহার এখনো প্রবল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৭৩ শতাংশ মানুষ এখনো নগদে লেনদেন করেন। অথচ ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানো গেলে বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় ব্যয় সাশ্রয় সম্ভব। এই ব্যয় মূলত টাকা ছাপানো, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার পেছনে চলে যায়। ফলে নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে জনপ্রিয় করা এখন কেবল প্রযুক্তির প্রশ্ন নয়, বরং অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর সমপ্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, প্রতি বছর টাকা ছাপানো, পরিবহন ও বণ্টনে বিশাল অঙ্কের অর্থ খরচ হয়। এ খরচ কমাতে হলে নগদ অর্থ ব্যবহারের প্রবণতা কমিয়ে আনতে হবে। তিনি জানান, কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেন জনপ্রিয় করতে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিগত সহায়তা ও প্রযুক্তি অবকাঠামো তৈরির কাজ করছে। লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে কিউআর কোড ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ফলে ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ভোক্তা- সবার জন্য লেনদেন হবে দ্রুত, নিরাপদ ও স্বচ্ছ। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘বাংলা কিউআর’ চালু করে, যাতে স্থানীয় ভাষায় সহজ পেমেন্ট সুবিধা দেওয়া যায়। দেশের সব ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানকে এ ব্যবস্থার মাধ্যমে লেনদেনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে রাজধানীর মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকায় ছোট দোকানগুলোতে কিউআর কোড থাকলেও অনেক ব্যবসায়ী তা ব্যবহার করছেন না। কর-জটিলতার আশঙ্কা এবং নগদে স্বাচ্ছন্দ্য হওয়াই ডিজিটাল লেনদেন এড়িয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ডিজিটাল মাধ্যমে যে পরিমাণ লেনদেন হচ্ছে, তার আড়াই গুণ বেশি এখনো নগদ টাকায় হয়। তবে উৎসব-পার্বণে, শহরাঞ্চলে এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ডিজিটাল লেনদেনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে মোবাইল ব্যাংকিং সেবার বিস্তার এবং ই-কমার্সের প্রসার এই পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ‘ইনক্লুসিভ ইনস্ট্যান্ট পেমেন্ট সিস্টেম’ চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে আরও গতিশীল করবে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশের সব নোট বাংলাদেশ টাকশাল থেকে ছাপানো হয়। কাগজের নোটের আয়ুষ্কাল মাত্র ছয় থেকে আট মাস, এই সময়ের মধ্যে অধিকাংশ নোট ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে যায়। কয়েনের খরচ বেশি হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী। পলিমার নোট চালুর চেষ্টা কার্যকর হয়নি। ফলে ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার শুধু প্রযুক্তিগত নয়, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও অপরিহার্য। বাংলাদেশে বর্তমানে ১৮ কোটির বেশি মোবাইল সংযোগ রয়েছে, যার একটি বড় অংশ স্মার্টফোন ব্যবহারকারী। বিকাশ, নগদ, রকেট, উপায়সহ একাধিক মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্ল্যাটফর্ম এখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও কার্যকরভাবে সেবা দিচ্ছে। ইউটিলিটি বিল, স্কুল ফি, ট্রেন-বাসের টিকিট, এমনকি হাটবাজারেও এখন ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার দেখা যায়। তবে ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থায় এখনো একটি বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক। অনেক ব্যবসায়ী কেবল নগদ গ্রহণ করেন, বা ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করলেও তা কর ব্যবস্থায় প্রতিফলিত হয় না। বাংলাদেশ ব্যাংক ডিজিটাল ব্যাংক চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে। নতুন ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্সের জন্য ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধনের সীমা ৩০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগে ছিল ১২৫ কোটি টাকা। এই ব্যাংকগুলো কোনো শাখা বা ওটিসি সেবা দেবে না, সব লেনদেন হবে অ্যাপ ও ডিজিটাল মাধ্যমে। ভার্চুয়াল কার্ড ও কিউআর কোডের মাধ্যমে লেনদেন সম্ভব হলেও প্লাস্টিক কার্ড দেওয়া যাবে না। বড় বা মাঝারি শিল্পে ঋণ দেওয়া যাবে না, শুধু ক্ষুদ্র ঋণ অনুমোদিত। পাঁচ বছরের মধ্যে পুঁজিবাজারে আইপিও আনা বাধ্যতামূলক। এদিকে, ডিজিটাল লেনদেনের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে প্রতারণা, হ্যাকিং, এবং তথ্য চুরির ঝুঁকি। সমপ্রতি একটি প্রতারক চক্র স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের গ্রাহকদের ক্রেডিট কার্ড থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলিম বলেন, ডিজিটাল লেনদেনে নিরাপত্তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। সাইবার আক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে, দক্ষতাও সমানভাবে বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, সাইবার নিরাপত্তায় বিনিয়োগকে খরচ নয়, ভবিষ্যতের বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত। তিনি জানান, ডিজিটাল ব্যাংক মূলত ক্ষুদ্র ও মাঝারি গ্রাহকদের জন্য কাজ করবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থাকে টেকসই করতে হলে প্রয়োজন বহুমুখী উদ্যোগ। ব্যবহারকারীদের সচেতনতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়াতে হবে। সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে- বিশেষ করে ব্যাংক ও এমএফএস প্ল্যাটফর্মে। একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যা ডিজিটাল লেনদেনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবে। কর কাঠামো স্পষ্ট করতে হবে, যাতে ব্যবসায়ীরা তা নিয়মিতভাবে অনুসরণ করেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে ডিজিটাল লেনদেনের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিশাল। তরুণ জনগোষ্ঠী, প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার এবং উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবনী শক্তি এই খাতকে আরও গতিশীল করতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবায়ন করতে হলে প্রয়োজন একটি নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং নীতিনির্ধারিত ডিজিটাল অর্থনৈতিক কাঠামো।