গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলা সদরে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী 'হরিমঞ্জুরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের' প্রধান শিক্ষক আব্দুল মালেকের অবসর জনিত আবেগঘন বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১২ জানুয়ারি সোমবার দুপুরে "মন মাধূরী" রেস্টুরেন্টে আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রধান শিক্ষককে বিদায় জানানো হয়। এসময় শিক্ষক-কর্মচারী, পরিচালনা কমিটির সদস্য, অভিভাবক ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা ফুলেল শুভেচ্ছা, বিভিন্ন উপহার ও চোখের জলে তাঁকে বিদায় দেন।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির
এডহক সভাপতি ও জেলা মহিলা দলের সভাপতি জান্নাতুল ফেরদৌসী বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন।
বিদ্যালয়ের প্রাক্তন সহকারী শিক্ষক আলমগীর হোসেনের পরিচালনায় অন্যান্যের মাঝে উপস্থিত ছিলেন কাপাসিয়া সদর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও বিআরডিবি চেয়ারম্যান মোঃ সেলিম হোসেন আরজু, কাপাসিয়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক সদস্য ও কাপাসিয়া প্রেসক্লাবের সভাপতি এফ এম কামাল হোসেন, কাপাসিয়া সদর ২ নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি জাহাঙ্গীর মাহমুদ, কাপাসিয়া সদর ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক মহিবুর রহমান, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য আসাদুজ্জামান সবুজ, নূরুজ্জামান জামান, উপজেলা মহিলা দলের সভাপতি শাহনাজ পারভীন শিখা, সাধারণ সম্পাদক শারমিন সুলতানা,
সহকারী শিক্ষক সুরাইয়া সুলতানা, পারভেজ, মাধূরী রানী, শামীমা আক্তার,
হিসাব রক্ষক আমজাদ হোসেন, শিক্ষার্থী ও মহিলা দল নেত্রী তানিয়া সুলতানা, শামীমা সুলতানা, স্টাফ কার্তীক, চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী সুফিয়া বেগম প্রমুখ।
প্রধান শিক্ষক আব্দুল মালেক ১৬ বছর আগে হরিমঞ্জুরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। ২০১০ সালে যোগদান করে বিদ্যালয়ের উল্লেখযোগ্য বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন করেছেন। এর মধ্যদিয়ে প্রধান শিক্ষকের দীর্ঘ কর্মময়জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটলো।
বিদায় অনুষ্ঠানে বিভিন্ন অতিথি, স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারী, কমিটির সদস্যবৃন্দ, অভিভাবকবৃন্দ, শুভাকাঙ্ক্ষী ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি জান্নাতুল ফেরদৌসী তার বক্তব্যে বলেন, অত্যান্ত দুঃখ ওভারাক্রান্ত মন নিয়ে বলতে হচ্ছে আজ আমাদের প্রিয় প্রধান শিক্ষকের বিদায় অনুষ্ঠান। যদিও আমরা মনে করি এটা একটা প্রতিষ্ঠান থেকে বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। কারণ তাঁকে মন থেকে চিরতরে বিদায় দেওয়া সম্ভব হবে না। তাই কবির চরণে বলতে হয়, "যেতে নাহি দিব হায়, তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়"।
দীর্ঘদিন ধরে এলাকার মেয়েরা এই প্রতিষ্ঠানে পড়েছে এবং এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি শিক্ষক শিক্ষিকাবৃন্দ তাদেরকে বিভিন্ন বিষয় অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পড়িয়েছেন তা তারা কখনোই ভুলবে না। প্রধান শিক্ষককে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনি সবসময় শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিয়েছেন। এজন্য তারা আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ। আপনি তাদের জন্য দোয়া করবেন যেন ভবিষ্যত শিক্ষাজীবনে তারা আরো উন্নতি করে দেশ ও জাতি গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। তাদের কোনো আচরণে যদি আপনি কোনো কষ্ট পেয়ে থাকেন বা ছোট কিংবা বড় কোনো ভুল করে থাকেন তাহলে তাদেরকে ক্ষমা করে দিবেন। সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীদের পক্ষ থেকে আমি বিনীতভাবে আপনার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
আপনার এই দীর্ঘ শিক্ষক জীবনের যে উজ্জ্বল ছোঁয়া দিয়ে আমাদের সকলকে আলোকিত করেছেন, তা বলে শেষ করা যাবে না। আপনার জ্ঞানের আলোয় আমরা যেমন আলোকিত হয়েছি, ঠিক তেমন ভাবে সেই জ্ঞানের আলো হারানোর বেদনায় আজ আমরা সবাই শোকাহত হয়ে যাচ্ছি। আপনাকে আমাদের বিদায় দিতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে আমার ভারাক্রান্ত মন চাচ্ছে আপনি আরো দীর্ঘদিন আমাদের প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করুন। তবে এর সাথে আমাদের সরকারি নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।
হে আমাদের প্রিয় বিদায়ী প্রধান শিক্ষক,
আপনি শুধু আমাদের শিক্ষকই ছিলেন না। আপনি ছিলেন আমাদের অভিভাবক ও বন্ধুর মতো। আমাদের যে কোন সমস্যার সমাধান আপনার কাছে পেয়ে যেতাম। আপনি সবসময় আমাদের মেয়েদের পড়াশোনার বিষয়ে উৎসাহ প্রদান করতেন। বিশেষ করে পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে তাদের পরীক্ষায় কিভাবে ভালো ফলাফল অর্জন করা যায় তা নিয়ে অনেক উপদেশ দিয়েছেন। যে উপদেশগুলো তারা কেউ সঠিকভাবে গ্রহণ করেছে আবার কেউ গ্রহণ করেনি। যারা আপনার উপদেশ সঠিকভাবে মেনেছে তারাই পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জন করতে পেরেছে। এছাড়াও আপনার উদারতা ও ক্লান্তি হীন জ্ঞানচর্চা আমাদের অনেক উৎসাহিত করে তুলেছে। আপনি সব সময় সত্যবাদী ও সত্যের পক্ষে কথা বলতেন। আমাদের সব সময় সত্য কাজে উৎসাহিত করতেন। যা আমাদের সকলের মনে এখনো গেঁথে আছে ও ভবিষ্যতে গেঁথে থাকবে। একজন শিক্ষকের মধ্যে যে এত গুণাবলী থাকতে পারে, আপনাকে না দেখে কেউ বিশ্বাস করতে পারবে না। কারণ আপনি ছিলেন বিশেষ কয়েকটি গুনে গুণান্বিত। যা আমাদের শিক্ষক মহলে খুবই কম দেখা যায়।
আপনি ছিলেন আমাদের আদর্শের শিরোমনি। যাকে দেখে শিক্ষা জীবনের পাশাপাশি বাস্তব জীবনে আদর্শবান হওয় যায়। তার প্রকাণ্ড প্রমাণ হলেন আপনি। যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা আদর্শবান হতে পেরেছে। শুধু শিক্ষার্থী বা তাদের সহপাঠী নয়, বিগত প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাও আপনার আদর্শকে ধারণ করে, এখন পর্যন্ত পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে।
উপস্থিত শিক্ষক-কর্মচারীরা বলেন,
আপনার দায়িত্বশীলতার কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে আপনার বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিত থাকার কথা। আপনি দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক পদে কর্মরত ছিলেন। কিন্তু আপনি কখনো বিদ্যালয় অনুপস্থিত থাকেননি। আমাদের জীবনে আমরা আপনাকে কখনো বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকতে দেখি নি। অর্থাৎ এটা থেকে প্রমাণ হলো আপনি খুবই দায়িত্বশীল একজন শিক্ষক ছিলেন। আপনার এই গুণের কারণে আমরা অনেকেই মনে প্রতিজ্ঞা করলাম, আমরাও কখনো অহেতুক কোন কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকবো না। যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তারা আরো বলেন, বিদায় প্রধানত দুই প্রকার চিরস্থায়ী ও ক্ষণস্থায়ী। আপনি আমাদের মাঝ থেকে শুধু ক্ষণস্থায়ী বিদায় নিচ্ছেন। এই কারণে আমাদের সকলের আপনার কাছে অনেক কিছু চাওয়ার রয়েছে। বিশেষ করে আমরা আপনার কাছে একটি জিনিস চাই। তা হল অবসরপ্রাপ্ত সময়ের পর, আপনি অবশ্যই আমাদের বিদ্যালয়ে নিয়মিত আসবেন। আপনার যতই ব্যস্ততা থাকুক না কেন। মাসে একবার হলেও আমাদের বিদ্যালয়ে এসে আমাদের জ্ঞানকে আরো উজ্জীবিত করে তুলবেন। আশা করি, আমাদের এই অনুরোধ আপনি অবশ্যই রাখবেন।