সুন্দরবনে বাড়ছে বাঘের বিচরণ, আশার আলো দেখছে বন বিভাগ

এফএনএস (সাবেরা ঝর্ণা; শরণখোলা, বাগেরহাট) : | প্রকাশ: ২৯ জুলাই, ২০২৬, ১২:০৬ পিএম
সুন্দরবনে বাড়ছে বাঘের বিচরণ, আশার আলো দেখছে বন বিভাগ

আজ ২৯ জুলাই বিশ্ব বাঘ দিবস। "সবাই হই সচেতন, বাঘ করি সংরক্ষণ"-এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বাগেরহাটের শরণখোলা রেঞ্জসহ সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জে একযোগে পালিত হচ্ছে দিবসটি। সুন্দরবনে সম্প্রতি বাঘের উপস্থিতি ও দৃশ্যমানতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বন বিভাগের কর্মী ও পর্যটকদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। বন কর্মকর্তারা মনে করছেন, কার্যকর নজরদারি ও সুরক্ষার ফলে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা পূর্বের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে পূর্ব সুন্দরবনের পৃথক দুটি এলাকায় খুব কাছ থেকে বাঘের দেখা পেয়েছেন বনরক্ষীরা। গত ২৬ জুলাই পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের অভয়ারণ্য কেন্দ্রের 'টাইগার পয়েন্ট' এলাকায় একটি বাঘকে নদী পার হতে দেখেন বনরক্ষীরা; ঘটনাটির ভিডিও চিত্র ধারণ করেন বনকর্মী বিএম সাইফুর রহমান। এর আগে ২৩ জুলাই চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্র ও বন বিভাগের টহল ফাঁড়ি অফিস সংলগ্ন এলাকায় একটি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার এসে প্রায় ১৫ মিনিট ঘোরাফেরা করে আবার বনে ফিরে যায়। এছাড়া গত ২০ মাসেও একাধিকবার বনরক্ষীদের চোখে পড়েছে বাঘ। বন কর্মকর্তারা জানান, টানা তিন মাসের নিষেধাজ্ঞার কারণে বর্তমানে বনে পর্যটক ও বনজীবীদের প্রবেশ বন্ধ রয়েছে। এই নিরিবিলি পরিবেশ বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক চলাচলের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করেছে।

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, বনের দুটি এলাকায় বনরক্ষীদের খুব কাছ থেকে দুটি বাঘের দেখা মেলা এবং আন্ধারমানিক এলাকায় বন অফিস চত্বরে বাঘের মুক্ত বিচরণ বিচরণ বৃদ্ধিরই স্পষ্ট প্রমাণ। তিনি বলেন, "গত ১৩ জুলাই চিকিৎসা শেষে বনে অবমুক্ত করা বাঘিনীটিকে পর্যবেক্ষণের জন্য ২০টি ক্যামেরা ট্র্যাপ বসানো হয়েছিল। সেখানে ওই বাঘিনী ছাড়াও আরও তিনটি বাঘের ছবি পাওয়া গেছে। এটি প্রাথমিক ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে যে সব স্থানে একই বাঘ ঘুরছে না। এছাড়া নিয়মিত টহলের সময় বনরক্ষীরা আগের চেয়ে বেশি বাঘের পায়ের ছাপ দেখতে পাচ্ছেন, যা বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয়।"

সর্বশেষ ২০২৪ সালের বাঘ জরিপ অনুযায়ী, সুন্দরবনে বর্তমানে ১২৫টি বাঘ রয়েছে, যার ৫৯ শতাংশ অবস্থান করছে বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবনে। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে সর্বাধুনিক ক্যামেরা ট্র্যাকিং পদ্ধতিতে এই জরিপ পরিচালিত হয়। সুন্দরবনের ৬০৫টি গ্রিডে ১,২১০টি ক্যামেরা টানা ৩১৮ দিন রেখে জরিপ চালানো হয়, যার মধ্যে ৩৬৮টি গ্রিডে বাঘের উপস্থিতি মেলে। সেখান থেকে প্রাপ্ত ৭,২৯৭টি ছবি ও ভিডিও চিত্র দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের দ্বারা বিশ্লেষণের পর বাঘের সংখ্যা ১২৫টি বলে নির্ধারণ করা হয়। জরিপকালে ২১টি বাঘের শাবকের ছবি পাওয়া গেলেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ছোট বয়সে মৃত্যুর হার বেশি থাকায় তাদের মূল গণনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এর আগে, ২০১৬ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত ২৪৯ দিনে ১,৬৫৯ কিলোমিটার এলাকায় ৪৯১টি সর্বাধুনিক ক্যামেরা ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন পর্যায়ে পর্যবেক্ষণ চালানো হয়। অতীতের তথ্যানুযায়ী, চোরাশিকারীদের দাপটে একসময় বাঘের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমলেও ২০১৫ সাল থেকে তা বাড়তে শুরু করে। ২০১৫ সালে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ১০৬টি, যা ২০১৮ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১১৪টিতে এবং সর্বশেষে তা ১২৫টিতে উন্নীত হয়।

সুন্দরবনের ৬ লাখ ১ হাজার ৭০০ হেক্টর আয়তনের মধ্যে ৩ লাখ ১৭ হাজার ৯৫০ হেক্টর এলাকাকে অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করে বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করা হয়েছে। সুন্দরবন খুলনা অঞ্চলের বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের ডিএফও নির্মল কুমার পাল জানান, বাঘের সাম্প্রতিক আনাগোনা ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে। বর্তমানে চলমান বাঘ সুরক্ষা প্রকল্পের মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হবে এবং ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি আরেকটি নতুন প্রকল্প শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে