তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা চলাকালে বন বিভাগের কঠোর নজরদারির মধ্যেও এক শ্রেণির অসাধু জেলে গভীর সুন্দরবনে ঢ়ুকে বিষ দিয়ে চিংড়ি মাছ ধরে শুঁটকি তৈরি করছে। মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় পৃথক অভিযানে চারটি অবৈধ শুঁটকির মাচা (টংঘর) গুঁড়িয়ে দিয়েছে বনরক্ষীরা। জব্দ করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ শুঁটকি চিংড়ি, তাজা চিংড়ি, ৭টি নৌকা, কীটনাশক, মাছ ধরার জাল, কাঁকড়া ধরার অবৈধ চারু ও একটি মোবাইল সেট। বিষ দিয়ে মাছ শিকারের এই অবৈধ কার্যক্রমে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে বলে উদ্বেগ জানিয়েছেন পরিবেশবাদীরা।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার (৩১ জুলাই) শরণখোলা রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) মো. শরিফুল ইসলামের নেতৃত্বে বনরক্ষীরা নিয়মিত টহলকালে শেলার চর টহল ফাঁড়ির আওতাধীন কালামিয়া ও নারকেলবাড়িয়া খাল সংলগ্ন দুর্গম বনাঞ্চলে অভিযান চালান। সেখানে অবৈধভাবে নির্মিত শুঁটকির মাচা থেকে ২ বস্তা শুঁটকি চিংড়ি, ১টি নৌকা, ২টি টোনা জাল ও ১টি মোবাইল সেট জব্দ করা হয়। বনরক্ষীদের আগমন টের পেয়ে জেলেরা বনের ভেতরে পালিয়ে যায়। পরে বনরক্ষীরা মাচাটি ধ্বংস করে দেন।
একই দিন বিকেলে শরণখোলা স্টেশন কর্মকর্তা মো. খলিলুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত আরেকটি অভিযানে শরণখোলা রেঞ্জের কোকিলমুনি ফাঁড়ির কবরখালী খাল এলাকায় মাছ ধরা অবস্থায় ৪টি জেলে নৌকা ও ১৫টি চর জাল জব্দ করা হয়। জেলেরা নৌকা থেকে লাফিয়ে বনে পালিয়ে যায়। নিষিদ্ধ সময়ে এভাবে প্রকাশ্যে মাছ ধরার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ফাঁড়ির কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠছে, যা তদন্তের দাবি রাখে।
এর আগে বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) চাঁদপাই রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) দ্বীপন চন্দ্র দাসের নেতৃত্বে দিনব্যাপী টহলকালে চরাপুটিয়া টহল ফাঁড়ির আওতাধীন কাগা খাল, ইন্দুরকানী খাল ও হরমাল খাল সংলগ্ন বনাঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করা হয়। হরমাল খালের কাছে বনের ভেতরে নির্মিত মাচা থেকে ২ বস্তা শুঁটকি চিংড়ি, ৫ বস্তা তাজা চিংড়ি, ২টি নৌকা, ২টি টুনা জাল, ২ লিটার বিষ (কীটনাশক) ও ৩ বস্তা চালসহ আনুষঙ্গিক মালামাল জব্দ করা হয়। একই এলাকার একটি খাল থেকে কাঁকড়া ধরার অবৈধ চারু বোঝাই একটি নৌকাও আটক করা হয়, তবে নৌকায় থাকা জেলেরা পালিয়ে যায়। নৌকাটি থেকে ৯৫টি চারু জব্দ করা হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই শুঁটকির মাচাগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
পরিবেশবাদী সংগঠন 'সুন্দরবন রক্ষায় আমরা'র সমন্বয়ক নুর আলম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, 'কীটনাশক পানিকে দূষিত করায় অসংখ্য জলজ প্রাণী মারা যাচ্ছে। বিষের ব্যবহার সুন্দরবনকে নীরবে ধ্বংস করছে এবং পুরো বাস্তুতন্ত্রকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।'
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, 'বর্তমানে সুন্দরবনে সব ধরনের প্রবেশে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এর মধ্যেই অসাধু জেলেরা বনরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে শুঁটকির মাচা বানিয়ে বিষ দিয়ে চিংড়ি ধরছিল। অভিযানে ধরা পড়ার পর মাচাগুলো ভেঙে দেওয়া হয়েছে। বন অপরাধীদের আটকে টহল কার্যক্রম আরও জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।'