‘বৃক্ষরোপণে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’-এই স্লোগান সামনে রেখে দেশজুড়ে যখন বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ রক্ষায় জনসচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, ঠিক তখনই সিলেটে সরকারি উদ্যোগে আয়োজিত বিভাগীয় বৃক্ষমেলা চলছে অনেকটাই দায়সারা গোছের ব্যবস্থাপনায়। সরকারি বরাদ্দ ও আয়োজনের প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও কোনো আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ছাড়াই শুরু হয়েছে ‘বৃক্ষরোপণ অভিযান ও সিলেট বিভাগীয় বৃক্ষমেলা-২০২৬’।
সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে পক্ষকালব্যাপী এ মেলা গত ১ আগস্ট শুরু হলেও এখন পর্যন্ত হয়নি কোনো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। অথচ মেলার মাঠে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি করা প্যান্ডেলটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে কঙ্কালসার কাঠামোর মতো। যেন একটি আয়োজনের ব্যর্থতা ও প্রশাসনিক উদাসীনতার নীরব সাক্ষী।
সিলেট বন বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের আয়োজনে দীর্ঘদিন ধরে বর্ণাঢ্য আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে বিভাগীয় বৃক্ষমেলা। গত দেড় দশকে নগরজুড়ে র্যালি, ফিতা কাটা, শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৃক্ষ বিতরণ, বেলুন উড়িয়ে উদ্বোধন, আলোচনা সভাসহ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে মেলাকে সাধারণ মানুষের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছে। মন্ত্রী, জনপ্রতিনিধি, বিভাগীয় কমিশনার, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে প্রাণবন্ত হয়ে উঠত পুরো আয়োজন। কিন্তু এবারের মেলায় সেই চিত্র পুরোপুরি উল্টো। কোনো বর্ণাঢ্য উদ্বোধন নেই, নেই দৃশ্যমান প্রচারণা, নেই জনসম্পৃক্ততার উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ। অনেকটা নীরবে, চুপিসারে শুরু হয়ে গেছে বিভাগীয় পর্যায়ের এই গুরুত্বপূর্ণ মেলা।
প্রশ্ন উঠেছে, বৃক্ষরোপণে মানুষকে উৎসাহিত করার জন্য যে মেলার আয়োজন, সেই মেলার খবরই যদি মানুষ না জানে, তাহলে এ আয়োজনের উদ্দেশ্য কতটুকু সফল হবে? মেলার প্রচার-প্রচারণার ঘাটতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অংশগ্রহণকারী নার্সারি ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিযোগ, দূর-দূরান্ত থেকে বিপুল অর্থ ব্যয় করে মেলায় স্টল নেওয়ার পর যদি প্রশাসনের পক্ষ থেকে যথাযথ প্রচারণা না থাকে, তাহলে দর্শনার্থী কমে গিয়ে ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হতে পারে।
সুগন্ধা নার্সারির স্বত্বাধিকারী মনোয়ারা বেগম বলেন, একটি স্টলে ক্যারিং, কর্মচারী, রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে স্টলের আকারভেদে প্রায় ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। যথাযথ প্রচার-প্রচারণা না থাকলে ব্যবসায়ীদের লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে।
মেলায় অংশ নেওয়া লিমন নার্সারীর প্রো: মো. আব্দর রব ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলেও সেটি কেন হয়নি, তা তাদের বোধগম্য নয়। তার মতে, মেলার প্রচার-প্রচারণার জন্য হলেও উদ্বোধনী অনুষ্ঠান করা প্রয়োজন ছিল। প্রচারের অভাবে স্টল ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।
সিলেট নার্সারি মালিক কল্যাণ সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ও সিলেট নার্সারির স্বত্বাধিকারী মলয় লাল ধর বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান না হলেও তারা নিজেদের উদ্যোগে মাইকিং করছেন, যাতে মানুষ মেলার বিষয়ে জানতে পারে। মেলা মূল্যায় কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মন্ত্রী দিয়ে উদ্বোধন করানোর জন্য বারবার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সময় পরিবর্তন করা হয়েছে। তিনি এ ঘটনাকে প্রশাসনিক উদাসীনতা ও ‘তৈলবাজির’ বহিঃপ্রকাশ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এ ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রশাসনের অবহেলা ও তাচ্ছিল্য কোনোভাবেই কাম্য নয়। এতে একদিকে যেমন সরকারের অর্থ ব্যয়ের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে মেলায় অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীরাও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
মেলা ব্যবস্থা কমিটির সদস সচিব জেলা বনকর্মকর্তা (ডিএও) মোহম্মদ আবদুর রহমান বলেন, বানিজ্য মন্ত্রীর উদ্বোধন করার কথা ছিল। বিশেষ প্রয়োজনে তিনি আসতে পারেন নি সেজন্য আনুষ্ঠানিকতা হয়নি। তবে প্রচারের জন্য আমরা মাইকিং, সাইনবোডসহ প্রচারণার ব্যাবস্থা করেছি। এবং নার্সারি মালিক বা ব্যবসায়ীরা সময় বৃদ্ধি চাইলে কমিটি আলোচনা সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত নিবে। মেলার ব্যাবস্থা কমিটির আহবায়ক সিলেটের জেলা প্রশাসক ফোন রিসিভ না করায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পরিবেশ কর্মীরা জানান, বৃক্ষ শুধু সৌন্দর্যের উপকরণ নয়; মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের অন্যতম প্রধান উৎস। জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ ও নগরায়নের আগ্রাসনের সময়ে বৃক্ষরোপণকে জনআন্দোলনে পরিণত করার লক্ষ্যেই প্রতিবছর বৃক্ষমেলার আয়োজন করা হয়। মেলায় সিঙ্গেল ও দ্বৈত নার্সারী, বন বিভাগের স্টল, খাবার স্টল, পুলিশ ক্যাম্পসহ মোট ৫০টি স্টল রয়েছে। সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ক্রেতা দর্শনার্থীদের জন্য উম্মোক্ত মেলা ১৫ আগষ্ট পর্যন্ত চলবে।