সন্তান জন্মের আশায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন প্রসূতি মোসা. কমলি বেগম (৩৫)। কিন্তু সিজারিয়ান অপারেশনের পর সন্তান নয়, লাশ হয়ে ফিরেছেন তিনি। গত শনিবার (৮ আগস্ট) রাতে রাজশাহীর গোদাগাড়ী মডেল হাসপাতালে তার মৃত্যুর পর ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন স্থানীয়রা। শুধু প্রসূতির মৃত্যুই নয়, হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবা, সিজারের প্রবণতা, রোগ নির্ণয়ে ভুল, রিপোর্টে অসঙ্গতি, নার্সদের দিয়ে চিকিৎসা করানো এবং রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের মতো গুরুতর অভিযোগও সামনে এসেছে। কমলি বেগমের মৃত্যুর খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাসপাতালটির বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ করতে থাকেন স্থানীয়রা। কারও অভিযোগের বিষয় ভুল রিপোর্ট, কারও অভিযোগ অপ্রয়োজনীয় সিজার, আবার কেউ দাবি করেছেন-এর আগেও একই হাসপাতালে সিজারের সময় রোগী বা নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক শামসুজ্জোহা বাবু বলেন, হাসপাতালের খবর ভালো। জরায়ুর রাস্তায় অতিরিক্ত রক্ষক্ষরণের জন্য এমনটা হয়েছে। চিকিৎসার কোন ঘাটতি ছিলো না। নিজে অপারেশন থিয়েটারে থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, রোগীর অবস্থা যখন খারাপ হয় তখন শেষ মূহুর্তে আমি অপারেশন পর ম্যাডাম চেম্বার থেকে রাজশাহীর দিকে চলে যাবে তখন ম্যাডামের সাথে গাড়ীতে যাওয়ার জন্য আমিও গিয়েছিলাম বলে দাবি করেন তিনি।
‘সুস্থ মানুষ লাশ হয়ে ফিরবে কেন?’
ফেসবুকে সোনিয়া খাতুন নামে একজন লিখেছেন, এর আগে এমন ঘটনার কথা শুনেছেন, কিন্তু কমলি বেগমের মৃতদেহ এবার নিজের চোখে দেখেছেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একজন সুস্থ মানুষ সন্তান জন্ম দিতে হাসপাতালে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরে আসবেন-এটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
তার ভাষায়, চিকিৎসকদের কাজ মানুষের কষ্ট কমানো। চিকিৎসায় ভুল বা অবহেলার কারণে কারও জীবন চলে গেলে তার দায় অবশ্যই নির্ধারণ করতে হবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, কমলি বেগমের মৃত্যুতে একটি শিশু তার মাকে হারিয়েছে-যে শিশু এখনো মায়ের মূল্য বোঝার বয়সেই পৌঁছায়নি।
‘আগেও এমন মৃত্যু হয়েছে’- দাবি স্থানীয়দের তন্ময় নামে একজন দাবি করেছেন, এর আগেও এ হাসপাতালে একই ধরনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে এবং টাকা দিয়ে তা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আবার মো: ওয়াদুদ নামে একজন দাবি করেছেন, সিজারের সময় তার এক বন্ধুর সন্তানও মারা গেছে। সোহানুর নামের একজন হাসপাতালের রিসেপশনে কর্মরতদের বিরুদ্ধে রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন। মো: আনারুলষ নামে একজন হাসপাতালটি সিলগালা করার দাবি জানিয়েছেন।মো: আসমত নামে আরেকজন হাসপাতাল বন্ধ এবং মালিককে গ্রেপ্তারের দাবি তুলেছেন। এসব মন্তব্যের পাশাপাশি হাসপাতালটির বিরুদ্ধে আরও অসংখ্য অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
‘বাচ্চা নেই, টিউমার’-ভুল রিপোর্টের অভিযোগ
জাহিদ হাসান নামে একজনের অভিযোগ আরও গুরুতর। তিনি দাবি করেছেন, তার স্ত্রী গর্ভবতী থাকা অবস্থায় গোদাগাড়ী মডেল হাসপাতালে পরীক্ষা করালে রিপোর্ট দেখে চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, পেটে সন্তান নেই; বরং টিউমার রয়েছে। পরে তিনি ওই রিপোর্টে বিশ্বাস না করে অন্য একটি হাসপাতালে পরীক্ষা করালে সেখানে তার স্ত্রীর পেটে সন্তান থাকার কথা জানানো হয় বলে দাবি করেন তিনি। অভিযোগটি সত্য হলে রোগ নির্ণয় ও রিপোর্ট প্রদানের ক্ষেত্রে হাসপাতালটির মান নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়। তবে এই অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
‘গেলেই সিজার’- আরেক অভিযোগ
সোহেল রানা নামে একজন অভিযোগ করেছেন, সন্তান প্রসবের জন্য হাসপাতালে গেলেই সিজারের পরামর্শ দেওয়া হয়। কখনো রোগীর পেটে পানি কম থাকার কথা বলা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
নার্সদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
মো: ওয়াদুদ-এর অভিযোগ, হাসপাতালে চিকিৎসকের চেয়ে নার্সরাই বেশি চিকিৎসার কাজ করেন। অন্য কয়েকজনের মন্তব্যেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগগুলো সত্য হলে প্রশ্ন উঠছে-অপারেশন থিয়েটারে কে চিকিৎসা দিয়েছেন, কে সিজার করেছেন, কার তত্ত্বাবধানে অপারেশন হয়েছে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ও নার্সদের যোগ্যতা ও দায়িত্ব কী ছিল?
তদন্ত কমিটি গঠন, কিন্তু স্বজনদেরই বাধা?
কমলি বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তের কথা জানিয়েছেন রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. এস আই এম রাজিউল করিম। তিনি বলেন, ঘটনার তদন্ত হবে এবং ইতোমধ্যে তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের পরিচালক ডা. মো. হাবিবুর রহমান জানান, সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে তারা ঘটনাটি জানতে পেরেছেন। ইতোমধ্যে তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। তদন্ত শেষে সঠিক প্রতিবেদন পাওয়া যাবে বলে আশা করেন তিনি। কিন্তু তদন্ত কমিটি হাসপাতালে যাওয়ার পরই নতুন অভিযোগ তুলেছেন নিহতের স্বজনরা।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) তদন্ত কমিটি হাসপাতালে অবস্থান করছে-এমন খবর পেয়ে কমলি বেগমের স্বজনরা সেখানে গেলে তাদের তদন্ত দলের সঙ্গে কথা বলতে দেওয়া হয়নি এবং হাসপাতালে প্রবেশেও বাধা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা। এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে-একজন নিহত রোগীর স্বজনদের বক্তব্য তদন্তে নেওয়া হবে না কেন? চিকিৎসা নিয়ে তাদের অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত কমিটির সামনে উপস্থাপনের সুযোগ না দিলে নিরপেক্ষ তদন্ত কতটা সম্ভব? শুধু কমলি বেগম নয়, পুরোনো অভিযোগও তদন্তের দাবি
স্থানীয়দের দাবি, শুধু কমলি বেগমের মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করলেই হবে না। হাসপাতালটির বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওঠা পূর্বের অভিযোগগুলোরও সত্যতা যাচাই করতে হবে। তাদের দাবি, হাসপাতালে গত কয়েক বছরে কতজন রোগীর সিজার হয়েছে, কতজনের স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে, সিজারের পর কতজন রোগী বা নবজাতকের জটিলতা কিংবা মৃত্যু হয়েছে-এসব তথ্যও প্রকাশ্যে আনা হোক। একই সঙ্গে হাসপাতালের চিকিৎসক-নার্সদের দায়িত্ব, অপারেশনে কারা উপস্থিত ছিলেন, রোগীর রিপোর্ট, আল্ট্রাসনোগ্রাম, অপারেশন নোট, ব্যবহৃত ওষুধ, রক্তের ব্যবস্থা এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ফরেনসিক ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে যাচাই করার দাবি উঠেছে।
‘তদন্ত যেন দায়সারা না হয়’ সচেতন মহলের মতে, একটি প্রসূতির মৃত্যু কোনোভাবেই কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। চিকিৎসায় অবহেলা, ভুল চিকিৎসা, ভুল রিপোর্ট বা ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে মৃত্যু হয়ে থাকলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আবার অভিযোগগুলো সত্য না হলে তদন্তের মাধ্যমেই সেটিও স্পষ্ট হওয়া জরুরি। নিহত কমলি বেগমের স্বজনদের দাবি-তদন্ত যেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। রোগীর স্বজন, দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রয়োজনীয় সব চিকিৎসা নথি যাচাই করে স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে হবে।