সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির শপথ

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ২১ আগস্ট, ২০২৬, ০২:৪৪ পিএম
সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির শপথ
ছবি: সংগৃহীত

দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে শপথ নেবেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শুক্রবার (২১ আগস্ট) বঙ্গভবনের ঐতিহাসিক দরবার হলে শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠান শুরু হবে সন্ধ্যা ৭টায়। জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে শপথবাক্য পাঠ করাবেন।

শপথ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান উপস্থিত থাকবেন। অতিথিদের সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার মধ্যে আসন গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে দরবার হলে প্রবেশ করবেন। এর পাঁচ মিনিট পর, সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিটে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দরবার হলে প্রবেশ করবেন।

শপথ অনুষ্ঠানকে ঘিরে বঙ্গভবনের দরবার হলের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. সরওয়ার আলম জানিয়েছেন, শপথ অনুষ্ঠানের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনায় দায়িত্ব পালন করবেন।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অনুষ্ঠানে ১২ শতাধিক অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আমন্ত্রিতদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি, তিন বাহিনীর প্রধান, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা থাকবেন। ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও বিদেশি কূটনীতিকদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

আমন্ত্রণপত্র অনুযায়ী, দরবার হলে রাষ্ট্রপতির প্রবেশের পর জাতীয় সংগীত ও কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। এরপর ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল রাষ্ট্রপতির শপথ পরিচালনা করবেন।

৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোট

এর আগে বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলে। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ৩৪৯ জন। এর মধ্যে ৩৪৩টি ব্যালট পেপার ব্যবহার করা হয়। অব্যবহৃত থাকে ছয়টি ব্যালট। ব্যবহৃত ৩৪৩টি ব্যালটই বৈধ ঘোষণা করা হয়।

বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পান ২৫৫ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট। ফলে অলি আহমদের চেয়ে ১৬৭ ভোট বেশি পেয়ে বিজয়ী হন মির্জা ফখরুল।

ভোটগ্রহণ শেষে বিকেল ৫টা ২৫ মিনিটে নির্বাচনের ফল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচনি কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন। ভোটের ফলাফল ঘোষণার পর সন্ধ্যায় এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়।

নির্বাচন চলাকালে ভুল-ত্রুটির কারণে চারটি ব্যালট পেপার পরিবর্তন করা হয়েছিল। ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বিধিমালার ১০ নম্বর বিধি অনুযায়ী এসব ব্যালট প্রতিস্থাপন করা হয়।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অনুপস্থিত ছিলেন ছয়জন ভোটার। তারা হলেন ঢাকা-৮ আসনের মির্জা আব্বাস, চট্টগ্রাম-৩ আসনের মোস্তফা কামাল পাশা, কিশোরগঞ্জ-৩ আসনের ওসমান ফারুক, সাতক্ষীরা-৪ আসনের গাজী নজরুল ইসলাম, খেলাফত মজলিসের আবুল হাসান এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের রুমিন ফারহানা। এর মধ্যে মির্জা আব্বাস ও মোস্তফা কামাল পাশা অসুস্থতার কথা জানিয়ে অনুপস্থিতির বিষয়ে চিঠি দিয়েছিলেন। আবুল হাসান দেশের বাইরে থাকায় ভোট দিতে পারেননি। গাজী নজরুল ইসলাম জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত। রুমিন ফারহানা কেন ভোট দেননি, তা জানা যায়নি।

শপথ ঘিরে বঙ্গভবনে ব্যাপক আয়োজন

নতুন রাষ্ট্রপতিকে বরণ করে নিতে বঙ্গভবনের দরবার হল প্রস্তুত করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. সরওয়ার আলম বলেন, “মহামান্য রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠানের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। সব আয়োজন শেষ হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এই শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করছে।”

রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত বঙ্গভবনের আশপাশের এলাকায় যান চলাচলের ক্ষেত্রে কিছু নির্দেশনা অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। তবে বঙ্গভবনে আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য এ নির্দেশনা প্রযোজ্য হবে না।

গত ২৪ জুলাই গুরুতর অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন আওয়ামী লীগ আমলে নির্বাচিত মো. সাহাবুদ্দিন। তাঁর পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। সেই ধারাবাহিকতায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দীর্ঘ বিরতির পর ভোটাভুটি

সংসদীয় পদ্ধতি পুনঃপ্রবর্তনের পর ১৯৯১ সালে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থী থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটাভুটি হয়েছিল। এরপর টানা সাতটি নির্বাচনে একজন করে প্রার্থী থাকায় ভোট ছাড়াই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এবার দুই প্রার্থী থাকায় আবারও সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন করা হয়।

নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অভিনন্দন জানান তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী ও এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম। অভিনন্দন বার্তায় তিনি আশা প্রকাশ করেন, রাষ্ট্র ও সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও ইনসাফের সুরক্ষায় দৃঢ়তা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন।

মির্জা ফখরুল নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসও তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, মির্জা ফখরুলের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আরও সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক পথে এগিয়ে যাবে।

বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানও নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, মির্জা ফখরুল তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা কাজে লাগিয়ে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে সংবিধান, আইনের শাসন, ইনসাফ ও জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করতে ভূমিকা রাখবেন।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। ১২ দলীয় জোটের পক্ষ থেকেও শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে। জোটের প্রধান ও জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, জোটের মুখপাত্র ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব ড. মাওলানা মুফতি গোলাম মহিউদ্দিন ইকরামসহ জোটের নেতারা অভিনন্দন জানিয়েছেন। এ ছাড়া ন্যাশনাল পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান ও সমমনা জোটের প্রধান সমন্বয়ক ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, জাসদ (শাজাহান সিরাজ) সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন খান এবং মজলিস ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিলও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

ঠাকুরগাঁওয়ে আনন্দ-উচ্ছ্বাস

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার খবরে তাঁর নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখা যায়। জেলা বিএনপি কার্যালয়ের সামনে নেতাকর্মীরা মিষ্টি বিতরণ করেন। পরে একটি আনন্দ র‌্যালি বের হয়ে শহরের প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে জেলা বিএনপি কার্যালয়ে গিয়ে শেষ হয়।

ঠাকুরগাঁও শহরের হলপাড়া এলাকার বাসিন্দা মাসুদ রানা বলেন, “মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় ঈদের চেয়েও আনন্দ লাগছে। কারণ ঈদ বছরে দুইবার এলেও তাঁর মতো মানুষ শত বছরেও আসে কিনা সন্দেহ আছে।”

ঠাকুরগাঁও রিভারভিউ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মুবীন রতন বলেন, “শিক্ষকতা করার কারণে ছোট-বড় সবার স্যার মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আমি স্যারের সরাসরি ছাত্র ছিলাম। তিনি কেমন মানুষ বলে বোঝাবার ভাষা নেই। তবে এতটুকু বলতে পারি স্যারের ছাত্র হওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।”

জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমিন বলেন, “আমরা সবাই খুবই আনন্দিত। আনন্দিত হওয়ার কারণ ঠাকুরগাঁও থেকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিএনপির রাজনীতি শুরু। জেলা বিএনপির সভাপতি থেকে তাঁর উত্থান। তিনি দীর্ঘদিন বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ ত্যাগ এবং তিতিক্ষার পরে তিনি তাঁর প্রাপ্য সম্মানটুকু অর্জন করেছেন।”

সন্ধ্যার শপথের মধ্য দিয়ে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেবেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে