গ্যাসের দাম নয়, টেকসই জ্বালানি কৌশলই প্রয়োজন

এফএনএস | প্রকাশ: ২১ আগস্ট, ২০২৬, ০৭:৩৪ পিএম
গ্যাসের দাম নয়, টেকসই জ্বালানি কৌশলই প্রয়োজন

ভর্তুকির চাপ কমাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সিএনজি খাতে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নতুন করে জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংকটকে সামনে এনেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি এবং পেট্রোবাংলার ক্রমবর্ধমান আর্থিক ঘাটতি নিঃসন্দেহে বাস্তবতা। তবে প্রশ্ন হলো, বারবার মূল্যবৃদ্ধি কি এই সংকটের স্থায়ী সমাধান দিতে পারবে? পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, গ্যাসের গড় ক্রয়মূল্য ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান তৈরি হওয়ায় বিপুল ভর্তুকি দিতে হচ্ছে সরকারকে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ফলে ব্যয় সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে বর্তমান আইন অনুযায়ী গ্যাসের মূল্য নির্ধারণে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) গণশুনানি ও আর্থিক বিশ্লেষণের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা ইতিবাচক দিক। তবে মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাব্য প্রভাবও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত বিদ্যুতের মূল্য ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে পড়ার আশঙ্কা থাকে। অন্যদিকে সিএনজির দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে পণ্য পরিবহন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি হতে পারে। তাই কেবল আর্থিক ঘাটতির হিসাব নয়, এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও সমান গুরুত্বে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বর্তমান সংকটের মূল কারণ কেবল আন্তর্জাতিক বাজার নয়; দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের ঘাটতিও এর জন্য দায়ী। একসময় দেশীয় গ্যাস উৎপাদন যে পর্যায়ে ছিল, তা ধারাবাহিকভাবে কমে এসেছে। ফলে আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা সরাসরি দেশের জ্বালানি খাতে প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় জ্বালানি নীতিতে নির্ধারিত অনুসন্ধান কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে আজকের পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন হতে পারত। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাই স্বল্পমেয়াদি মূল্য সমন্বয়ের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর জোর দিতে হবে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সিস্টেম লস কমানো, জ্বালানি খাতে দক্ষতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মূল্যবৃদ্ধি যদি অনিবার্যও হয়, তবে তা হতে হবে স্বচ্ছ, যুক্তিসংগত এবং জনস্বার্থ বিবেচনায়। একই সঙ্গে জনগণের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ না বাড়িয়ে জ্বালানি খাতকে টেকসই ও আত্মনির্ভর করার দিকেই রাষ্ট্রের নীতিগত অগ্রাধিকার থাকা উচিত।