দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক বন্যা শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি দীর্ঘদিনের পরিবেশ অব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতারও কঠিন প্রতিফলন। টানা বর্ষণ ও উজানের ঢল এ দুর্যোগকে তীব্র করেছে ঠিকই, তবে পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড় কাটা, অবৈধ ইটভাটার বিস্তার, খাল-জলাশয় ভরাট এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ বন্যার ক্ষয়ক্ষতি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে প্রকৃতির ওপর মানুষের হস্তক্ষেপ আজ মানুষের জীবন-জীবিকার জন্যই বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় পাহাড় কেটে মাটি সরবরাহের অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে অভিযান, মামলা ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের খবর এলেও অবৈধ কর্মকাণ্ড পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য বলছে, অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিক বা নিম্নস্তরের ব্যক্তিরা আইনের আওতায় এলেও মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। যদি এমন অভিযোগ সত্য হয়, তবে তা আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। পরিবেশবিধ্বংসী অপরাধে প্রকৃত দায়ীদের আইনের আওতায় আনা না গেলে অভিযান কেবল সাময়িক উদ্যোগেই সীমাবদ্ধ থাকবে। পরিবেশের ক্ষতি কখনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পাহাড় কেটে সরানো মাটি খাল, নদী ও জলাশয়ে জমে পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ সংকুচিত করে। একই সঙ্গে ফসলি জমি ও জলাধার ভরাট হওয়ায় প্রকৃতির পানি ধারণক্ষমতা কমে যায়। ফলে অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিও দ্রুত বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণ হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক দুর্যোগ সেই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্ট করেছে। অন্যদিকে বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণেও পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে। দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ ঘিরে পানি প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার যে প্রশ্ন উঠেছে, তা নিরপেক্ষ কারিগরি মূল্যায়নের দাবি রাখে। উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তা যেন প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রবাহ ও স্থানীয় জনপদের নিরাপত্তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়। ভবিষ্যতের যেকোনো প্রকল্পে পরিবেশগত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় প্রশমনব্যবস্থা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। পরিবেশ অধিদপ্তর জনবল ও আইনি সীমাবদ্ধতার কথা বলছে। বাস্তবতা যাই হোক, অবৈধ পাহাড় কাটা ও ইটভাটার বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি, আন্তঃসংস্থার সমন্বয় এবং আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রয়োজন। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি ও রাজনৈতিক সদিচ্ছাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, কিন্তু পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো যায়। দক্ষিণ চট্টগ্রামের বন্যা সেই শিক্ষা আবারও সামনে এনেছে। এখন প্রয়োজন দায় নিরূপণ, আইন প্রয়োগে বৈষম্য দূর করা এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। অন্যথায় পাহাড়ের ক্ষত একসময় সমগ্র জনপদের দুর্ভোগে পরিণত হতে থাকবে।