সিমেন্টের কাঁচামাল কেনার নামে ভুয়া বিল-ভাউচার দেখিয়ে ১৪১ কোটি ২০ লাখ টাকা আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারের অভিযোগে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীসহ ২৯ জনের বিরুদ্ধে তিনটি পৃথক মামলা দায়েরের অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দুদক এ অনুমোদন দেয়।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, আরামিট সিমেন্ট পিএলসির নামে প্রকৃত কোনো ক্রয়-বিক্রয় না করেই কাঁচামাল কেনার ভুয়া বিল-ভাউচার ব্যবহার করে এসব অর্থ নেওয়া হয়। পরে ২৭টি ডিলের মাধ্যমে অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তরের পর নগদে উত্তোলন, আগের দায় পরিশোধ এবং বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মামলাগুলোর মধ্যে প্রথম ঘটনায় ২০১৮ সালের ২০ মার্চ আরামিট সিমেন্টের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আগ্রাবাদ শাখার গ্রাহক ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের নামে একটি ডিলের মাধ্যমে ৫৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ঘটনায় ১৬ জনকে আসামি করা হয়েছে।
দ্বিতীয় ঘটনায় ২০১৮ সালের ৪ এপ্রিল থেকে ২০১৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি), কামাল বাজার শাখার গ্রাহক ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের নামে ১৭টি ডিলের মাধ্যমে ৪১ কোটি ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এ মামলায়ও ১৬ জনকে আসামি করা হয়েছে।
তৃতীয় ঘটনায় ২০২০ সালের ৬ আগস্ট থেকে ২০২১ সালের ২৮ মার্চ পর্যন্ত ইউসিবির সদরঘাট শাখায় ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের নামে নয়টি ডিলের মাধ্যমে ৪২ কোটি ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ঘটনায় ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ওই ডিলগুলোতে মোট ৪৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ছিল, যার মধ্যে গ্রাহকের নিজস্ব অংশ ছিল ৪ কোটি ৬৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
দুদকের অভিযোগ, আরামিট গ্রুপের মালিক ও তৎকালীন ভূমিমন্ত্রী হিসেবে সাইফুজ্জামান চৌধুরী ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ অনুমোদনে ভূমিকা রাখেন। পরে আরামিট গ্রুপের কর্মচারীদের বাইরের প্রতিষ্ঠানের মালিক সাজিয়ে ভুয়া সরবরাহকারী হিসেবে দেখানো হয়। তাদের মাধ্যমে ভুয়া আবেদন, বিল ও কাগজপত্র তৈরি করে ডিল অনুমোদন করানো হয়।
দুদকের নথিতে সাইফুজ্জামান চৌধুরীকে এসব লেনদেনের অর্থ আত্মসাতের ‘আলটিমেট বেনিফিশিয়ারি’ ও অন্যতম হোতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, অনুমোদিত ঋণের অর্থ বিভিন্নভাবে হস্তান্তর ও স্থানান্তরের পর নগদে উত্তোলন, পূর্বের দায় পরিশোধ এবং বিদেশে পাচারে তার ভূমিকা ছিল।
সাইফুজ্জামানের স্ত্রী রুখমীলা জামানও মামলার আসামি। তিনি আরামিট সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ইউসিবির সাবেক চেয়ারম্যান। দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি প্রভাব খাটিয়ে ঋণ অনুমোদন এবং ভুয়া সরবরাহকারীর মাধ্যমে ডিল অনুমোদনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেন।
আরামিট সিমেন্টের চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার মোহাম্মদ শাহ আলমের বিরুদ্ধেও ভুয়া ও মিথ্যা আবেদন করে ডিল অনুমোদন এবং পরে অর্থ হস্তান্তর, স্থানান্তর, রূপান্তর, নগদ উত্তোলন, পূর্বের দায় পরিশোধ ও বিদেশে পাচারে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির এজিএম মো. আব্দুল আজীজের বিরুদ্ধে ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের মালিক সেজে ভুয়া সরবরাহকারী হিসেবে আবেদন করা এবং ডিল অনুমোদনে সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছে। দুদকের নথি অনুযায়ী, তিনি আরামিট গ্রুপের এজিএম ও সাইফুজ্জামান চৌধুরীর পিএস হিসেবেও কাজ করতেন। তার বিরুদ্ধে ব্যাংক হিসাব খোলা, ভুয়া পরিদর্শন প্রতিবেদন দাখিল এবং অর্থ পাচারে সহযোগিতার অভিযোগও রয়েছে।
আরামিট সিমেন্টের আরেক এজিএম এ কে এম মারুফের বিরুদ্ধেও প্রকৃত মালামাল সরবরাহ না হলেও ভুয়া আবেদন করে ডিল অনুমোদন করানোর অভিযোগ রয়েছে।
মামলাগুলোতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির জুবলী রোড শাখা, ইউসিবি কামাল বাজার শাখা এবং ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখার কর্মকর্তাদেরও আসামি করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রকৃত মালামাল সরবরাহ না থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন নথিতে স্বাক্ষর, ডিল অনুমোদন, পেমেন্ট অর্ডার ইস্যু এবং অর্থ ছাড়ে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে।
আসামিদের মধ্যে আরও রয়েছেন মোহাম্মদ শাহ আলম, মো. আব্দুল আজিজ, একেএম মারুফ, মো. জাকির হোসেন, মোহাম্মদ আব্দুল হক, মুহাম্মদ তানভীর হাসান, মো. আব্দুল কাদের, মো. মিজানুর রহমান ভূঁইয়া, মুহাম্মদ আব্দুল করিম, মো. আখতার হোসেন, মোহাম্মদ জামাল উদ্দীন, মুহাম্মদ নিজাম উদ্দীন, মো. আশরাফ উদ্দীন, মোহাম্মদ রাশেদ সাদাত, আক্তারুল আজীম, মো. মাহিউদ্দীন, মো. খোরশেদ আলম, মো. শহিদুল্লাহ, মো. হারুন আল রশিদ, মো. মহসীন আলী, আবুল কালাম আজাদ, শেখ মনিরুজ্জামান, মো. রুবেল উদ্দিন, কে এ এম ইয়াসির হেলালী, ওয়াহিদুজ্জামান চৌধুরী, মো. এমদাদুল হাসান ও খোরশেদ আলম।
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, আত্মসাতের অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তরের পর নগদে উত্তোলন করা হয়। এর একটি অংশ আগের দায় পরিশোধে এবং বাকি অর্থ বিদেশে পাচারে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে অর্থ পাঠানো এবং ওই অর্থ দিয়ে সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে।
মামলাগুলোর জন্য দুদক দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২-এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তারা ডিলের বিপরীতে কোনো মালামাল সরবরাহ না হলেও অফিস নোট, পে-অর্ডার ইস্যু সংক্রান্ত নির্দেশনাসহ বিভিন্ন নথিতে স্বাক্ষর করেছেন। অর্থ ছাড়ের পর এর গতিপথ যথাযথভাবে অনুসরণ না করার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগের ধারাবাহিকতার মধ্যে নতুন তিনটি মামলা যুক্ত হলো। এর আগে তার বিরুদ্ধে ইউসিবি-সংশ্লিষ্ট ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে দুদক মামলা করেছে বলে সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।