আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে দেশজুড়ে লাখ লাখ এআই ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। কারণঅপরাধ দমনে এআই ক্যামেরা অত্যন্ত কার্যকরী একটি প্রযুক্তি। যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধী শনাক্ত, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন ও সন্দেহজনক গতিবিধি রিয়েল-টাইমে চিহ্নিত করতে পারে। বিশ্বের অন্যান্য আধুনিক দেশের মতো অপরাধ দমনে এদেশেও প্রযুক্তিনির্ভর কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। ওই লক্ষ্যে ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ পুলিশ ১০ লাখ এআই ক্যামেরা কিনতে যাচ্ছে। তাতে প্রায় ১৩শ কোটি টাকা ব্যয় হবে। পুলিশ সদর দপ্তর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী দেশের ৬৪টি জেলা ও সব মহানগর এলাকা এআই ক্যামেরার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাছাড়া দেশের সবকটি মহাসড়কও এআই ক্যামেরার আওতায় আনা হবে। আগামী দুই বছরের মধ্যে পুলিশ সদর দপ্তর ক্যামেরাগুলো স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে। ইতিমধ্যে ঢাকা মহানগর এলাকার বিভিন্ন স্থানে এআই ক্যামেরা বসিয়ে সফলতা মিলেছে। সেজন্যই ঢাকার অপরাধ নিয়ন্ত্রণেও মূল সড়কসহ আনাচে-কানাচেও ক্যামেরা বসাবে পুুলিশ। আর ওই ক্যামেরাগুলো ক্রয় ও রক্ষণাবেক্ষণে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াসহ আরো কয়েকটি দেশ সহায়তা করবে।
সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশের শহরগুলোতে ক্রমাগত জনসংখ্যার চাপ, যানজট এবং আধুনিক ধাঁচের অপরাধ বাড়ার কারণে প্রচলিত নজরদারি ব্যবস্থা যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারছে না। কারণ সাধারণ সিসি ক্যামেরা কেবল ফুটেজ রেকর্ড করতে পারলেও রিয়েল-টাইমে কোনো অপরাধ শনাক্ত করতে সক্ষম নয়। ওই সীমাবদ্ধতা দূর করতেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন বিশেষায়িত নজরদারি ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুলিশ। ইতিমধ্যে রাজধানীতে এআই ক্যামেরা চালুর মাধ্যমে ট্রাফিক তদারকিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। সড়কে যানজট কমে শৃঙ্খলা ফিরছে। বর্তমান বিশ্বের শক্তিশালী হাতিয়ার হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। তার মাধ্যমে উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন নগরী অপরাধ হ্রাস করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। সেজন্যই দেশের প্রতিটি জেলা শহর, মহানগর এলাকা ও মহাসড়ক আনা হবে এআই ক্যামেরার আওতায়। সেজন্য কেনা হবে প্রায় এক লাখেরও বেশি এআই ক্যামেরা। আপাতত ৫শ কোটি টাকার বাজেট ধরা হয়েছে। দুই বছরের মধ্যে ক্যামেরাগুলো স্থাপন করা হবে। আশা করা যায় তাতে অপরাধ ও ট্রাফিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে আসবে।
সূত্র আরো জানায়, এআই ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয় বিশ্লেষণ ক্ষমতা রাখে। ওই নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত ক্যামেরাগুলো যেকোনো দ্রুতগতি যানবাহনের নম্বর প্লেট মুহূর্তের মধ্যে স্ক্যান করে জাতীয় ডেটাবেজের সঙ্গে মেলাতে পারবে। তাছাড়া কোনো অপরাধী পালিয়ে গেলেও সহজেই ধরা পড়বে। কারণ এআই ক্যামেরাগুলো জনবহুল এলাকার হাজারো মানুষের মুখের অবয়ব স্ক্যান করতে পারবে। ফলে আদালতের সাজাপ্রাপ্ত আসামি, পরোয়ানাভুক্ত অপরাধী কিংবা নিখোঁজ ব্যক্তিদের ছবি ডেটাবেজে থাকলে ক্যামেরা তাদের শনাক্ত করে নিকটস্থ কন্ট্রোল রুমে সংকেত পাঠাবে। তাছাড়া কোনো স্থানে অনেক মানুষের অস্বাভাবিক জটলা, মারামারি, আগুন লাগা বা দীর্ঘ সময় ধরে পরিত্যক্ত বস্তু পড়ে থাকতে দেখলেও ওই ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যালার্ম বাজাবে। বর্তমানে রাজধানীতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এআই ক্যামেরার ব্যবহার সুফল দিচ্ছে। এখন সহজেই সড়কে আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে। আর এআই ক্যামেরা স্থাপনের পর বেশিরভাগ সড়কে ফিরেছে শৃঙ্খলা। মূলত এআই ক্যামেরা সহজেই কম্পিউটার বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ফলে অনেক দূর থেকেও স্পষ্ট ছবি শনাক্ত করা যাবে। তবে প্রতিটি ক্যামেরার দাম ৫২ হাজার টাকারও বেশি পড়বে। ওই ক্যামেরার সফটওয়্যারে ৬ ধরনের আইন অমান্যের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ওসব আইন অমান্যকারীদের এআই ক্যামেরা শনাক্ত করবে। ইতিমধ্যে সফটওয়্যারের সঙ্গে বিআরটিএ সার্ভার যুক্ত করা হয়েছে। ফলে আইন লঙ্ঘনকারী যানবাহনের নম্বর দিয়েই জরিমানা বা মামলার তথ্য মুঠোফোনে মালিকদের কাছে চলে যাচ্ছে। একই কায়দায় অপরাধীদেরও শনাক্ত করা সম্ভব হবে। যদিও এখনো কোন দেশ থেকে ক্যামেরাগুলো ক্রয় করা হবে তা নির্ধারণ হয়নি। তবে চীন থেকেই আনার সম্ভাবনাই বেশি। উন্নতমানের এআই ক্যামেরায় বেশি নজর দেয়া হচ্ছে। ওই ক্যামেরাগুলো ঘোর অন্ধকার, কুয়াশা বা প্রতিকূল আবহাওয়ায়ও পরিষ্কার ছবি ও অবয়ব শনাক্ত করতে সক্ষম হবে। ফলে শহরের হটস্পটগুলোতে ফেসিয়াল রিকগনিশন সিস্টেম সক্রিয় থাকলে পেশাদার অপরাধীদের উপস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে চিহ্নিত করা যাবে। আর ঘটনার পর অপরাধী যদি গাড়িতে করে পালিয়ে যায়, এআই ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওই গাড়ির নম্বর প্লেট ট্র্যাক করে পরবর্তী প্রতিটি মোড়ে পুলিশকে তার অবস্থান জানিয়ে দেবে। অপহৃত ব্যক্তি বা নিখোঁজ শিশুদের খুঁজে বের করতেও ফেসিয়াল ডেটাবেজ প্রযুক্তি বিশেষ সহায়ক হবে।
এদিকে আইন না মানার প্রবণতাই সড়ক শৃঙ্খলার প্রধান সমস্যা। এআই ক্যামেরা বসানোর পর সিগন্যাল অমান্য করা, রং সাইডে গাড়ি চালানো, হেলমেট না পরা, ট্রাফিক লাইন অতিক্রম করা বা নির্দিষ্ট গতির চেয়ে বেশি গতিতে গাড়ি চালালে স্বয়ংিক্রভাবে ই-মামলা তৈরি হবে এবং মালিকের মোবাইলে মেসেজ চলে যাবে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট রোডে গাড়ির চাপের ওপর ভিত্তি করে এআই সিস্টেম সিগন্যালের সবুজ ও লাল বাতির সময়সীমা নিজে থেকেই সামঞ্জস্য করবে। অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস বা আইনশৃঙ্খলার কাজে নিয়োজিত গাড়ি দেখলে এআই ট্রাফিক সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে লেন খালি করে গ্রিন সিগন্যাল তৈরি করবে। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর ডেটাবেজের সঙ্গে ক্যামেরা নেটওয়ার্ক যুক্ত থাকবে। তাতে কোনো নাগরিক ৯৯৯-এ ফোন দিয়ে সাহায্য চাইলে ঘটনাস্থলের নিকটস্থ এআই ক্যামেরার লাইভ ফিড অপারেটরের সামনে দৃশ্যমান হবে। দেশের সব মহাসড়কেই এআই ক্যামেরা বসানো হবে। আগস্টের শেষের দিকে ঢাকা-মাওয়া সড়কে এআই ক্যামেরা স্থাপন হবে। হাইওয়ে পুলিশ এ নিয়ে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে। অন্যান্য সড়কেও ক্যামেরাগুলোতে কীভাবে ক্যামেরা বসানো হবে পুলিশ সদর দপ্তর তার পরিকল্পনাও করেছে। ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-রাজশাহী, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-বগুড়া, ঢাকা-রংপুর, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-বরিশাল, ঢাকা-খুলনাসহ আঞ্চলিকসহ অন্যান্য সড়কেও ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। আর ওই ক্যামেরাগুলো স্থাপনের ফলে যানবাহন মনিটরিং, অতিরিক্ত গতি, চাঁদাবাজিসহ অন্যান্য অপরাধ, জরিমানা আদায় সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করবে পুলিশ। তাছাড়া খুব শিগগিরই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এআই প্রযুক্তিনির্ভর অটো ফাইন সিস্টেম চালু করতে যাচ্ছে হাইওয়ে পুলিশ। ফলে ওভারস্পিড, অবৈধ পার্কিং, উল্টোপথে যানবাহন চালনাসহ ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া সহজ হবে। এ ব্যবস্থায় আইন অমান্যকারী যানবাহনের মালিকের মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে মামলার তথ্য প্রেরণ করা হবে। যা মহাসড়কে যান চলাচলে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসে ভূমিকা রাখবে।
অন্যদিকে নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষায় কঠোর ডেটা সুরক্ষা আইন মেনে ওই নেটওয়ার্ক পরিচালিত হবে। ডেটা সেন্টারের সুরক্ষায় জাতীয় স্তরের ফায়ারওয়াল এবং এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক হবে। ক্যামেরাগুলো পরিচালনার জন্য পুলিশ ও কারিগরি দলগুলোকে এআই ডেটা বিশ্লেষণ এবং সিস্টেম পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিকমানের প্রশিক্ষণ দেবে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলো। এ নিয়ে বিশেষ নির্দেশনা পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।
এ প্রসঙ্গে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিসুর রহমান জানান, বর্তমানে রাজধানীর ১৬টি পয়েন্টে ৩৭টি এআই ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। তাতে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরতে শুরু করেছে। চালকদের মাঝে সচেতনতা এসেছে, আইন ভাঙার প্রবণতাও কমেছে। আগামী ৬ মাসের মধ্যে রাজধানীর দুই শতাধিক পয়েন্টে এআই ক্যামেরা স্থাপনের কাজ শেষ হবে। তখন ঢাকার বড় একটি অংশ নজরদারির মধ্যে চলে আসবে। গাড়ি চুরি রোধেও কাজ করছে এআই ক্যামেরা। অপরাধীদের ধরতেও এআই ক্যামেরার সহায়তা নেয়া হচ্ছে।