বিরোধীদলের আন্দোলনে ভয় পেলে সরকারকে দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল ও রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চল পরিচালক মাওলানা আব্দুল হালিম। তিনি বলেন, ‘এজন্যেই আমাদের এ আন্দোলনে কিছুটা মনে হয় হৃদকম্পন অনুভব করছে বর্তমান সরকার। আমরা বলব, যে ভয় পেলে দাবি মেনে নেন। গণভোটের রায় বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন।’
শনিবার (২৯ আগস্ট) দুপুরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী রংপুর মহানগর কার্যালয়ে ১১ দলীয় ঐক্য ঘোষিত ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা টু রংপুর লংমার্চ বাস্তবায়নে প্রস্তুতি সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চল।
মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, ১১ দলের লং মার্চের 'ছয় দফা' দাবির মধ্যে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন একটি মৌলিক দাবি। সরকার প্রেসিডেন্টের আদেশ অনুযায়ী জাতীয় সংসদের ভোট এবং জুলাই সংস্কার বাস্তবায়নে গণভোটের বিষয় সামনে এনেছিল। এর মধ্যে একটি মেনে বিএনপি সরকার গঠন করেছে এবং সরকার পরিচালনা করছে। কিন্তু গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার দাবি উপেক্ষা করছে। এতে জনগণকে অপমান করা হচ্ছে এবং জনগণের মধ্যে ‘শুভংকরের ফাঁকি’ খোঁজার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিএনপির নেতাদের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে পালন করার কথা বলা হলেও গণভোটের বিষয়টি মানা হচ্ছে না। এ দুটির মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। জনগণ এর সোজা-সাপটা জবাব চায়। জনগণ ভোট দিয়ে সরকার গঠনের সুযোগ দিয়েছে, আর জামায়াতে ইসলামী বর্তমানে বিরোধী দলের অবস্থানে রয়েছে। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন করা হলে জুলাই বিপ্লব ও গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার যে আকাঙ্ক্ষা, সেটিও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কথায় কথায় পল্টনের ময়দান ও শাহবাগের কথা বলেন এবং এসব বক্তব্য তাচ্ছিল্যের সুরে দেওয়া হচ্ছে। অথচ তিনি ভিন্নভাবে, স্বাগত জানানোর মতো করেও কথা বলতে পারেন। জুলাই যোদ্ধা হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদকে ঘিরে দেওয়া বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা করেন। তাঁর ভাষ্য, শাহবাগ স্কয়ারের কারণেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে একসময় পালিয়ে থাকতে হয়েছে বা পালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে বড় বড় লম্বা কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধ ও ২৪ এর আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, একাত্তরে এ দেশের মানুষের রক্তের কারণে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সম্মান ও স্বাধীনতা জাতির অহংকার। কিন্তু ২৪ শে জুলাই আন্দোলন আধিপত্যবাদী শক্তির কবর রচনা করেছে। সেই চেতনাকে ধারণ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা ভূমিকা পালন করেছেন, তাদের সম্মান সমুন্নত রাখতে হবে। একই সঙ্গে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের গণরায় গ্রহণ করে এগিয়ে যেতে হবে। রংপুরে বিএনপির চেয়ারপার্সনের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করে রংপুরের সমাবেশে তিনি বলেছিলেন, দুটি ভোট দেবেন, একটি গণভোট আরেকটি তাঁর দলের ভোট। এখন আবু সাঈদসহ শহীদদের সঙ্গে কেন প্রতারণা করা হচ্ছে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
দেশের জনজীবনের সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সার-সংকটের কারণে মানুষ উদ্বিগ্ন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতেও মানুষ দিশেহারা। অথচ বিএনপি ৩১ দফার মধ্যে স্থানীয় সরকারের নিরপেক্ষতার অঙ্গীকার করেছিল। জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, দেশের অর্ধশত জেলা পরিষদে দলীয় লোকদের প্রশাসক পদে বসানো হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে দেড় থেকে দুই লাখ ভোট কম পেয়ে পরাজিত হওয়া দলীয় লোকদের প্রশাসক পদে বসানোর মাধ্যমে জনগণের ভোটের সঙ্গে তামাশা করা হচ্ছে।
রংপুর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রংপুরের ছয়টি আসনে মানুষ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের ভোট দিয়েছে এবং একটি আসনে এনসিপিকে ভোট দিয়েছে। সে হিসেবে জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রে জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে জামায়াতে ইসলামী থেকে প্রশাসক নিয়োগের দাবি জানান তিনি। সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সিটি করপোরেশনে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, আগে এসব প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন স্তরের দপ্তরের সচিব কিংবা দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হতো। কিন্তু এখন দলের পরিচিত ও পদমর্যাদার লোকদের নিয়োগ দিয়ে সরকার ফ্যাসিস্ট সরকারের চেয়েও দলীয়করণের সংকীর্ণতার পরিচয় দিচ্ছে। ১৯ সেপ্টেম্বর ঘোষিত ঢাকা টু রংপুর লংমার্চের কর্মসূচি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে রংপুর জেলা স্কুল পর্যন্ত মানবপ্রাচীর হবে, মানুষের আওয়াজ উঠবে এবং নেতৃবৃন্দের হুংকার আসবে। তিনি বলেন, মানুষের কাছে যেতে হবে, পথসভা, মিছিল ও পিকেটিংয়ের মাধ্যমে গণভোটের গণরায় মানার দাবি তুলে ধরতে হবে। শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালনে রংপুর ও দিনাজপুরের দায়িত্বশীলরা ঐক্যবদ্ধ থাকবেন।
ইনশাআল্লাহ, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে সরকার বাধ্য হবে। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলের সহকারী অঞ্চল পরিচালক অধ্যক্ষ মাওলানা মমতাজ উদ্দিন, রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চল টিম সদস্য মাওলানা আব্দুল হাকিম, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও রংপুর মহানগর আমীর উপাধ্যক্ষ মাওলানা এটিএম আজম খান, রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চল টিম সদস্য আব্দুল বাতেন, রংপুর মহানগর সেক্রটারী কে এম আনোয়ারুল হক কাজল, রংপুর জেলা সেক্রেটারী মাওলানা এনামুল হক, নীলফামারী জেলা আমীর মাওলানা আব্দুস সাত্তার এমপি ও সেক্রেটারী মাওলানা আনতাজুল ইসলাম, পঞ্চগড় জেলা আমীর মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন ও সেক্রেটারী মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন, ঠাকুরগাঁও জেলা আমীর অধ্যাপক বেলাল উদ্দিন প্রধান ও সেক্রেটারী মোহাম্মদ আলমগীর, দিনাজপুর জেলা আমীর অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আনিছুর রহমান ও সেক্রেটারী মুহাদ্দিস ডক্টর এনামুল হক, গাইবান্ধা জেলা আমীর মোহাম্মদ আব্দুল করিম সরকার এমপি ও ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারী সৈয়দ রোকনুজ্জামান, কুড়িগ্রাম জেলা আমীর অধ্যক্ষ আজিজুর রহমান সরকার ও ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারী আব্দুল হামিদ মিয়া এবং লালমনিরহাট জেলা আমীর এডভোকেট আবু তাহের ও সেক্রেটারী এডভোকেট ফিরোজ হায়দার লাভলু। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যকারী পরিষদ সদস্য ও রংপুর মহানগরীর সভাপতি মো: আনিছুর রহমান, সেক্রেটারী মো: সাজ্জাদ হোসাঈন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি আব্দুর রাকিব মুরাদ, সেক্রেটারী ইমরান খান, রংপুর জেলা সভাপতি মো: হামিদুর রহমান, সেক্রেটারী মো: হানিফুর রহমান স্বাধীন, গাইবান্ধা জেলা সভাপতি ইফসুফ আল কারজাভি, সেক্রেটারী ফাহিম মন্ডল প্রমুখ।