অজানাই থেকে যাচ্ছে বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে একাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার রহস্য

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:৪৫ এএম
অজানাই থেকে যাচ্ছে বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে একাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার রহস্য

অজানাই থেকে যাচ্ছে হযরত শাহজালাল (রা.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিজেলে একাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার রহস্য। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর একাধিক তদন্ত কমিটি। কিন্তু কোনো তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনই আশার আলো দেখাচ্ছে না। ফলে বিমানবন্দরে বারবার অগ্নিকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি এবং বিপুল পরিমাণ জাতীয় সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হলেও তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন নিয়ে রহস্যময়তায় নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। কারণ শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান গেটওয়ে। প্রতিদিন সেখান দিয়ে কোটি কোটি টাকার ইলেকট্রনিকস, গার্মেন্ট কাঁচামাল, ফার্মাসিউটিক্যালস কেমিক্যালসহ জরুরি পণ্য দেশে আমদানি-রফতানি হয়। কিন্তু বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বারবার আগুনের কবলে পড়ে আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইনে দেশের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। পাশাপাশি আগুনে ভৌত অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি তো রয়েছেই। অথচ অগ্নিকাণ্ডের পরপরই বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) কিংবা ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে ঢাকঢোল পিটিয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়। আমদানি ও রফতানিকারক এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ কমপ্লেক্সে চলতি বছরের ৫ জুন রাতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। তার আগে গত বছরের ১৮ অক্টোবর দুপুরেও কার্গো ভিলেজ কমপ্লেক্সে অগ্নিকান্ড ঘটে। ওসব অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়েও। কারণ আগুন লাগার সময় গোয়েন্দারা এসব ঘটনার পেছনে অদৃশ্য শক্তির সম্পৃক্ততা রয়েছে বারবার বলে এসেছে। আর গঠিত তদন্ত কমিটিগুলোরও প্রাথমিক লক্ষ্য ছিলো আগুনের মূল উৎস ও প্রাথমিক কারণ নির্ধারণ করা, নাশকতার আলামত বা ষড়যন্ত্র আছে কিনা তা বের করা, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সংস্থা বা ব্যক্তিদের গাফিলতি চিহ্নিত করা ও ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ করা। কিন্তু কার্গো ভিলেজের অগ্নিকাণ্ড-সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদনগুলো ঘিরে এক ধরনের অনিশ্চিয়তা ও রহস্য তৈরি হয়েছে।

সূত্র জানায়, বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জমা পড়েনি তদন্ত প্রতিবেদন। আবার প্রতিবেদন জমা হলেও জনসম্মুখে আনা হয়নি মূল তথ্য। ফলে ওসব অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার তথ্য কেন গোপন করা হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ প্রতিটি আন্তর্জাতিক বা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আগুনের ঘটনায় প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটকে দায়ি করে দায় এড়ানোর চেষ্টা দেখা যায়। কার্গো ভিলেজের ক্ষেত্রেও ঘটেনি তার ব্যতিক্রম। অথচ বিমানবন্দরে আধুনিক অগ্নিনির্বাপক-ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দরে শর্টসার্কিট প্রতিরোধে একাধিক সেফটি লেয়ার থাকার কথা। বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের শেডগুলোতে কোটি কোটি টাকার পণ্য থাকে। বারবার কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ডে শুল্ক ফাঁকি পণ্যের হিসাবের গরমিল বা কোনো চক্রের অবৈধ সুবিধা লোটার প্রমাণ ঢাকতে ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগানো হয়েছে কিনা তা নিয়ে অনেকেই সন্দেহ করছে। ওসব বিষয় কিন্তু তদন্ত কমিটিগুলো গভীরভাবে খতিয়ে দেখেছে কিনা তার স্পষ্ট কোনো উত্তর থাকছে না সচরাচর প্রতিবেদনে।

সূত্র আরো জানায়, বিমানবন্দরে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের  (বেবিচক) তদন্ত কমিটি কার্গো ও কুরিয়ার এলাকায় অগ্নিঝুঁকি কমাতে ১৭ দফা সুপারিশ করেছে। ওই প্রতিবেদনে বৈদ্যুতিক স্থাপনার আশপাশে মালামাল রাখা, অনুমোদিত সীমার বাইরে বৈদ্যুতিক লোড ব্যবহার, নিম্নমানের ক্যাবল ওয়্যারিং, বিপজ্জনক পণ্য অনিয়ন্ত্রিতভাবে সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা তদারকির ঘাটতিকে অগ্নিঝুঁকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যদিও কার্গো ও কুরিয়ার ইউনিটগুলোতে দাহ্য ও বিপজ্জনক পণ্য আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (আইকাও) ও আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থার (আইএটিএ) মানদণ্ড অনুযায়ী পৃথকভাবে সংরক্ষণ ও চিহ্নিত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাছাড়া ওসব পণ্যের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে ডেটাবেজভিত্তিক ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালুরও সুপারিশ করা হয়েছে। বেবিচকের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, প্রধান ও বৈদ্যুতিক বিতরণ বোর্ড (এমডিবি ও এসডিবি), রোড লাইটসহ সব ধরনের বৈদ্যুতিক স্থাপনার অন্তত এক মিটারের মধ্যে কোনো মালামাল রাখা যাবে না। তাছাড়া বেবিচকের প্রকৌশল বিভাগকে কার্গো ও কুরিয়ার এলাকার বৈদ্যুতিক অবকাঠামো নিয়মিত পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে বলা হয়। ওয়ারিং, ক্যাবল, এমডিবি, এসডিবি, আর্থিং ও লাইটনিং প্রোটেকশন ব্যবস্থা প্রতি মাসে অন্তত এক থেকে দুবার পরিদর্শন; বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) ও আন্তর্জাতিক অগ্নিনিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী ওসব পরীক্ষা করার কথা বলা হয়। তাছাড়া কার্গো গুদামে দীর্ঘদিন নিলামযোগ্য পণ্য পড়ে থাকাকে নিরাপত্তাঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করে ওসব পণ্যের নিলাম প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে বলেছে। আর প্রতিটি কার্গো ও কুরিয়ার ইউনিটে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র এমন স্থানে রাখতে হবে, যাতে জরুরি অবস্থায় কনটেইনার বা তালাবদ্ধ স্থাপনার বাইরে থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহার করা যায়। ফায়ার সেফটি ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং যৌথ মহড়ার আয়োজনেরও সুপারিশ করা হয়েছে।

এদিকে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে প্রতিকেজি পণ্য আমদানিতে শূন্য দশমিক ২৯ মার্কিন ডলার চার্জ আদায় করা হয়। তার মধ্যে শূন্য দশমিক ১০ ডলার  বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস আর শূন্য দশমিক ১৯ ডলার নেয় বেবিচক। মালামালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং করছে বিমান। তাদের ওপরে রয়েছে বেবিচক। কিন্তু অগ্নিকাণ্ডে ব্যবসায়ীদের বিপুল আর্থিক ক্ষতি হলেও তা নিয়ে কেউ কিছু বলছে না। রপ্তানিকারকরা দীর্ঘদিন ধরে বিমানবন্দরে লজিস্টিক অদক্ষতা ও অপর্যাপ্ত অবকাঠামো নিয়ে অভিযোগ করে আসছে। আর সীমিত স্থান ও অপর্যাপ্ত গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থার কারণে মালবাহী বিমানের পরিচালনাও সীমিত। এতো সীমাবদ্ধতার পরও হযরজ শাহজালাল বিমানবন্দরে পণ্য পরিবহন খরচ অন্য দেশের তুলনায় বেশি। তারপর যদি আগুন লাগে তাহলে ব্যবসায়ীরা কোথায় যাবে। আর বারবার বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগার কথা না। এসব ঘটনার পেছনে কেউ না কেউ জড়িত। কিন্তু তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ওসব বিষয়ে কোনো তথ্য থাকছে না। বর্তমানে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে বছরে ১ লাখ ৭৫ হাজার টন পণ্য পরিবহন করা হয়। বিমান ছাড়া এমিরেটস এয়ারলাইনস, ক্যাথে প্যাসিফিক, কাতার এয়ারওয়েজ, টার্কিশ এয়ারলাইনস ও ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনস ঢাকা থেকে কার্গো পরিবহন পরিচালনা করে।

অন্যদিকে বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে গেছে বিপুল অঙ্কের পণ্য। ধ্বংস হয়েছে গার্মেন্টস রপ্তানির চালান, ওষুধশিল্পের কাঁচামাল ও আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের কয়েকশ শিপমেন্ট। এ শুধু ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতি নয়, দেশের শিল্প ও সরবরাহ ব্যবস্থারও আঘাত। উড়োজাহাজ থেকে কার্গো নামানো থেকে শুরু করে আমদানিকারকের হাতে পণ্য বুঝিয়ে দেয়া পর্যন্ত দায়িত্বে থাকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস (বিমান)। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য না তুললে বিমান প্রতিদিনের জন্য আলাদা ফিও নিচ্ছে। আর বেবিচক বিমানবন্দরের মালিক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও কার্গো টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা তদারকি করে। সেজন্য বিমানবন্দর ব্যবহার, নিরাপত্তা যাচাই, স্ক্যানিং ও পার্কিং চার্জ নেয় বেবিচক।

এ প্রসঙ্গে বেবিচক সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মেহবুব খান জানান, বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুনের ঘটনায় তদন্ত কমিটির দেয়া প্রতিবেদন বাস্তবায়নে প্রতিটি শাখাকে কঠোরভাবে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দায়িত্ব পালনে কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে