শিক্ষার আলো ছড়ানোর কথা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। অথচ নীলফামারীর সৈয়দপুরে বেশ কয়েকটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শিক্ষার নামে নানা খাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। অস্বাভাবিক মাসিক বেতন, ভর্তি ফি, ফরম পূরণের ফি, বিদ্যুৎ ও পানি ফিসহ নানা অজুহাতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ অভিভাবকদের। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অভিভাবকদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ ও হতাশা।
অভিভাবকদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানভেদে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শ্রেণিভেদে মাসিক বেতন নেওয়া হচ্ছে প্রায় ৮০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের ফি। ফলে সন্তানের পড়াশোনার ব্যয় বহন করতে গিয়ে অনেক পরিবারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
প্রশ্ন উঠেছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কি শিক্ষা বিস্তারের জায়গা, নাকি ক্রমেই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষার ব্যয় থাকা স্বাভাবিক হলেও তা যেন অভিভাবকদের ওপর অযৌক্তিক আর্থিক চাপ সৃষ্টি না করে, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।
অভিভাবকদের আরও অভিযোগ, দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বেতন মওকুফ বা অর্ধেক বেতন নেওয়ার সুযোগ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠান এ ক্ষেত্রে উদাসীন। আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও কোনো ছাড় দেওয়া হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে মেধাবী অথচ দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
একটি স্কুল অ্যান্ড কলেজ নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন এক অভিভাবক। তাঁর দাবি, সন্তানের বেতন কিছুটা কমানোর অনুরোধ নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষের কাছে গেলে তা নাকচ করে দেওয়া হয়। এমনকি আর্থিক অসুবিধার বিষয়টি জানিয়েও কোনো ছাড় পাননি বলে অভিযোগ তাঁর। বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান,এখন কোনো করার নেই। ওই স্কুল এন্ড কলেজে চলে নীরব দুর্নীতি। প্রতিষ্ঠানের আয়া দিয়ে অধ্যক্ষের বাসায় কাজ করারও অভিযোগ রয়েছে।
অভিভাবকদের প্রশ্ন,একজন শিক্ষার্থী যদি মেধাবী হয় কিন্তু তার পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত থাকে, তাহলে তার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মানবিক সহযোগিতার সুযোগ থাকবে না কেন।
সৈয়দপুরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত ফি আদায় ও বেতন নির্ধারণ নিয়ে অভিযোগ থাকলেও কার্যকর তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিভাবকরা। তাঁদের অভিযোগ,বিষয়গুলো নিয়ে শিক্ষা কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করেও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার পাওয়া যায় না। ফলে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ নিজেদের মতো করে বেতন ও বিভিন্ন ফি নির্ধারণের সুযোগ পাচ্ছে। অভিভাবকদের ভাষ্য, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোন খাতে কত টাকা নেওয়া যাবে, তার একটি স্বচ্ছ ও কঠোর নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিয়মিতভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়-ব্যয়ের হিসাব ও ফি আদায়ের বিষয়টি তদারকি করা দরকার।
অভিভাবকদের অভিযোগ, কিছু প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের আচরণ এমন যে, আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের সন্তানদের জন্য সেখানে পড়াশোনা করা যেন কঠিন হয়ে উঠেছে। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বেতন ফ্রি বা অর্ধেক করার নিয়ম থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ না থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে।
একাধিক অভিভাবক বলেন,সন্তানের পড়াশোনার জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। কিন্তু মাসিক বেতন, ভর্তি ফি, ফরম পূরণের ফি, বিদ্যুৎ-পানি ফিসহ নানা খরচ যোগ হলে তা আমাদের সামর্থ্যরে বাইরে চলে যায়। শিক্ষা যদি সবার অধিকার হয়, তাহলে অর্থের কারণে একজন মেধাবী শিক্ষার্থী কেন পিছিয়ে থাকবে।
সচেতন মহলের দাবি, সৈয়দপুরের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বেতন ও বিভিন্ন ধরনের ফি আদায়ের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি নজর দেওয়া উচিত। কোন প্রতিষ্ঠানে কোন খাতে কত টাকা নেওয়া হচ্ছে, তার তালিকা প্রকাশ এবং সরকারি বিধি-বিধান অনুসরণ করা হচ্ছে কি না তা তদন্ত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বেতন মওকুফ বা অর্ধেক বেতনের সুযোগ বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন অভিভাবকরা। তাঁদের প্রশ্ন,শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার ও জাতি গঠনের প্রধান হাতিয়ার। সেই শিক্ষার আড়ালে যদি অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের প্রতিযোগিতা চলে, তাহলে এর লাগাম টানবে কে। অভিভাবকদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বিভাগ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাণিজ্যিকীকরণের প্রবণতা থেকে বের করে শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করবে।