মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের আগস্ট মাসের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন আমাদের সমাজের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা, হত্যা, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, আত্মহত্যা, অপহরণ ও নিখোঁজের ঘটনা বেড়েছে। বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ৭২ শতাংশ বৃদ্ধি এবং নারী-শিশু হত্যার সংখ্যা এক মাসে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়া। এ ধরনের পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যাগত বৃদ্ধি নয়, বরং সামাজিক নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের গভীর সংকটের প্রতিফলন। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বেআইনি সালিশের ভয়াবহ চিত্র। ধর্ষণ, যৌন হয়রানি কিংবা শিশুর প্রতি সহিংসতার মতো গুরুতর অপরাধ স্থানীয়ভাবে অর্থের বিনিময়ে মীমাংসা করা হচ্ছে। এতে ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং অপরাধীরা দায়মুক্তির সুযোগ পাচ্ছেন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সহিংসতায় আহতের সংখ্যা জুলাইয়ের ৯৫ জন থেকে আগস্টে ২৬৭ জনে উন্নীত হয়েছে। এটি গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য বড় হুমকি। অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের সংখ্যা বেড়ে ৭১-এ দাঁড়িয়েছে, যা সমাজে ভয় ও অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনও আগস্টে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিমা ভাঙচুর, হামলা ও হত্যার ঘটনা সামাজিক সমপ্রীতির জন্য গুরুতর হুমকি। সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মামলা ও গ্রেপ্তার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট যে, মানবাধিকার সুরক্ষায় আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। অপরাধীরা শাস্তি না পেলে সহিংসতা বাড়বেই। তাই সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, গুরুতর অপরাধ সালিশে নিষ্পত্তি বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হবে। তৃতীয়ত, হেফাজত ও কারাগারে মৃত্যুর ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে। সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ জোরদার করা জরুরি। অজ্ঞাতনামা লাশের প্রতিটি ঘটনায় পরিচয় শনাক্তকরণ, ময়নাতদন্ত ও দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা অপরিহার্য। আমরা মনে করি, মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, বরং একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রয়োজন। নিয়মিত ও নিরপেক্ষ মনিটরিং, তথ্যের যথাযথ যাচাই এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপ মানবাধিকার সুরক্ষা ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি শক্তিশালী করতে পারে। সহিংসতা ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভাঙতে হলে দ্রুত বিচার, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা এবং অপরাধীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। মানবাধিকার সুরক্ষা শুধু আইনের প্রশ্ন নয়, এটি গণতন্ত্র ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি।