বরাদ্দ ও পরিকল্পনা বাড়লেও বদলায়নি স্বাস্থ্যখাতের চিত্র

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:২৫ এএম
বরাদ্দ ও পরিকল্পনা বাড়লেও বদলায়নি স্বাস্থ্যখাতের চিত্র

বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাসে স্বাস্থ্য খাতকে ঢেলে সাজাতে বেশকিছু নীতিগত ঘোষণা ও প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তিতে তার কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে রেকর্ড ৬৯ হাজার ৪০১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া এবং জাতীয় বাজেটের অংশ বাড়িয়ে মোট জিডিপির ১ দশমিক ০২ শতাংশে উন্নীত করার পরেও সরকারি হাসপাতাল ও স্থানীয় চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে সেবার কাঙ্ক্ষিত মান বৃদ্ধি পায়নি। জানা যায়, ঘোষিত নির্বাচনি ইশতেহার ও রাজস্ব বাজেটের বড় অংকের প্রতিশ্রুতির বিচারে বর্তমান সরকারের প্রথম ছয় মাসকে প্রস্তুতি বা পরিকল্পনা পর্ব বলা চলে, কারণ সরকারি হাসপাতালগুলোতে দীর্ঘ লাইন, চিকিৎসা সামগ্রীর সংকট এবং বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে অতিরিক্ত খরচের জাঁতাকলে সাধারণ রোগীদের ভোগান্তি আগের মতোই অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। সমপ্রতি স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন ১৯২টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে হস্তান্তর করা এবং শহরাঞ্চলের প্রাথমিক চিকিৎসা প্রসারে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) নতুন প্রকল্প পাসের মাধ্যমে প্রশাসনিক গতি আনার চেষ্টা করা হলেও, গ্রামীণ ও প্রান্তিক পর্যায়ে তার প্রকৃত সুফল পৌঁছাতে আরো দীর্ঘ সময় লাগবে বলে মনে করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, দেশে সমপ্রতি আকস্মিক দেখা দেওয়া প্রাণঘাতী হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় দ্রুত টিকা ক্রয় ও চিকিৎসাসেবা বিস্তারের মাধ্যমে সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান তৎপরতা দেখানো হলেও, এই রোগে প্রায় হাজার খানেক শিশুর অকাল মৃত্যুর দায় কোনোভাবেই এড়ানোর সুযোগ নেই। তবে শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষায় খুলনা, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী ও কুমিল্লায় ২০০ শয্যাবিশিষ্ট পাঁচটি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল নির্মাণের কাজ শুরু হওয়ার পাশাপাশি দেশের ৫০৩টি উপজেলা হাসপাতালকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার সরকারি ঘোষণা তৃণমূলের চিকিৎসাব্যবস্থায় ইতিবাচক আশার সঞ্চার করেছে। এর বাইরে মাঠপর্যায়ে সেবা ত্বরান্বিত করতে ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী এবং ৫ হাজার নতুন চিকিৎসক নিয়োগের দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং প্রতিটি নাগরিকের জন্য পৃথক ই-হেলথ কার্ডের নকশা প্রণয়নের কাজ বাস্তবায়িত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধুমাত্র নতুন অবকাঠামো তৈরি বা হাসপাতালের আসন সংখ্যা বাড়ালেই স্বাস্থ্য খাতের বহুমাত্রিক সংকট দূর করা সম্ভব নয়, বরং সাধারণ মানুষের পকেটের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। স্বাস্থ্য খাতের এই সার্বিক ধীরগতি ও সাধারণ মানুষের বিপুল প্রত্যাশার পূর্ণ প্রতিফলন না থাকা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করছেন দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিগত ছয় মাসে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গৃহীত কার্যক্রমগুলো মূলত নিয়মিত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও ইচ্ছাপূরণের সাময়িক তালিকা মাত্র, যা দিয়ে পুরো স্বাস্থ্য খাতের জরাজীর্ণ ও ভঙ্গুর কাঠামো ঢেলে সাজানো সম্ভব নয়। তাদের স্পষ্ট অভিমত হলো, বড় বাজেটের ঘোষণা আসলেও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বা প্রাইমারি হেলথ কেয়ারে বিনিয়োগের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ এবং নতুন বিশাল জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখার কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা এখনো তৈরি হয়নি। তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, টুকরো টুকরো পরিকল্পনার বদলে পুরো স্বাস্থ্য খাতকে টেকসই ও দুর্নীতিমুক্ত করতে অবিলম্বে একটি স্বাধীন ‘স্বাস্থ্য কমিশন’ গঠন করা প্রয়োজন, যা সার্বিক সংস্কার পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং মাঠপর্যায়ের অগ্রগতি নিরপেক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। সরকারের নীতিনির্ধারকেরা অবশ্য দাবি করছেন যে এটি বাস্তবায়নের প্রাথমিক প্রস্তুতিমূলক সময়, তাই প্রশাসনিক প্রস্তুতি শেষ হলে দেশের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবার দৃশ্যমান পরিবর্তন নিশ্চিত হবে। অন্যদিকে, বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা কমানো এবং দেশের ভেতরেই জটিল রোগের বিশ্বমানের সেবা নিশ্চিত করতে ব্রিটিশ স্বাস্থ্য প্রশাসনের অনুকরণে দেশের কাঠামো পুনর্গঠনের একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, জাতীয় ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে যুক্তরাজ্যের মেডিসিন্স অ্যান্ড হেলথকেয়ার প্রোডাক্টস রেগুলেটরি এজেন্সির (এমএইচআরএ) আদলে পুনর্গঠন এবং ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস)-এর ধাঁচে প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা তৈরির চিন্তা ইতিবাচক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ওষুধ ও রোগ নির্ণয় পরীক্ষার একটি বাধ্যতামূলক তালিকা ও যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণের কাজ শুরু করা হয়েছে, যা কার্যকর হলে সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে অন্যায্য ফি আদায় বন্ধ হবে। জানা গেছে, দেশের ৬৫৪টি সরকারি হাসপাতালে প্রায় ৭২ হাজার শয্যা চালু থাকলেও অতিরিক্ত ভিড়, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও দীর্ঘ সময়ের অপচয়ের দরুন মাত্র ১৪ দশমিক ৪১ শতাংশ মানুষ সরকারি সেবা নিতে যান। অবশিষ্টাংশের বড় অংশকেই বাধ্য হয়ে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও বাণিজ্যিক হাসপাতালের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যেখানে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার প্রাইভেট হাসপাতালে ১ লাখ ১০ হাজার শয্যা এবং ১০ হাজারেরও বেশি নিবন্ধিত ডায়াগনস্টিক সেন্টার সক্রিয় রয়েছে। চিকিৎসা চাহিদা মেটাতে দেশের বেসরকারি খাত বড় ভূমিকা রাখলেও অতিরিক্ত মুনাফাকেন্দ্রিক প্রবৃত্তি, স্বচ্ছতার অভাব এবং দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যে সাধারণ রোগীরা প্রতিনিয়ত প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, পর্যাপ্ত জনবল ও প্রযুক্তির অভাবে ক্যানসার, কিডনি ও লিভার প্রতিস্থাপনের মতো জটিল রোগে চিকিৎসার আইনি ও প্রযুক্তিগত জটিলতা এখনো রয়ে গেছে, যার ফলে চিকিৎসা খরচ মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে নিঃস্ব হতে হচ্ছে। এই অনিয়ম প্রতিরোধে ‘বাংলাদেশ হেলথ কমিশন’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রতিটি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিককে কাজের গুণগত মানের ওপর ভিত্তি করে গ্রেডিং পদ্ধতির আওতায় আনার তাগিদ দিচ্ছেন চিকিৎসাসংশ্লিষ্টরা। একই সাথে হৃদরোগ, ক্যানসার বা জটিল অস্ত্রোপচারের উচ্চ ব্যয় থেকে দরিদ্র মানুষকে সুরক্ষা দিতে অনতিবিলম্বে দেশে সর্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থা চালু করা জরুরি হয়ে পড়েছে। নীতিনির্ধারকদের কেবল বাজেট বাড়ানো বা কাগজ-কলমের পরিকল্পনায় সীমাবদ্ধ না থেকে প্রতিটি হাসপাতালের বাহ্যিক ব্যবস্থাপনা ও সেবার মান নিয়ন্ত্রণে আপসহীন নীতি বজায় রাখতে হবে, তবেই দেশের সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্য খাতের প্রকৃত সুফল ভোগ করতে পারবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে