অপরাধ দমনে আইনের কার্যকর প্রয়োগ জরুরি

নারী ও শিশু নির্যাতন বাড়ছে

এফএনএস | প্রকাশ: ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:০২ পিএম
নারী ও শিশু নির্যাতন বাড়ছে

দেশে নারী ও শিশুর ওপর নির্যাতনের ঘটনা কোনোভাবেই থামছে না। বরং সাম্প্রতিক বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও ঘটনাপ্রবাহ থেকে দেখা যাচ্ছে, নির্যাতনের ধরন যেমন বহুমুখী হচ্ছে, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে এর নৃশংসতাও বাড়ছে। গত জুন মাসে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ৩২০টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। জুলাইয়ে এ সংখ্যা কিছুটা কমে ৩০৬টিতে দাঁড়ালেও ধর্ষণ ও আত্মহত্যার মতো গুরুতর অপরাধের ঘটনা বেড়েছে। এর পর আগস্টে নারী ও শিশু হত্যার ঘটনা জুলাইয়ের ৫২টি থেকে বেড়ে ৯১টিতে এবং দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ৭টি থেকে বেড়ে ১২টিতে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসের তথ্যও উদ্বেগজনক। এ সময়ে দেশে ১ হাজার ৬৬৭ নারী ও শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছে এবং ২৯২ নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে মে-এই তিন মাসে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সারা দেশে ৫ হাজার ৪৪৮টি মামলা হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, অপরাধের অনেক ঘটনা এখন আরও নৃশংস রূপ নিচ্ছে। ধর্ষণের পাশাপাশি ধর্ষণের পর হত্যা, দলবদ্ধ ধর্ষণ, অপহরণ, যৌন নিপীড়ন ও শারীরিক নির্যাতনের মতো ঘটনা যেন নিয়মিত হয়ে উঠছে। এক গবেষণায় দেখা যায়, মে মাসে ৩০৫ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়, যাদের মধ্যে ৮৩ জন ধর্ষণের শিকার হন। ধর্ষণের শিকারদের প্রায় ৭০ শতাংশের বয়স ছিল ১৮ বছরের নিচে। একই সময়ে যৌন নিপীড়নের শিকার ৭৬ জনের মধ্যে ৪২ জনই ছিল শিশু। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কঠোর আইন থাকলেও অপরাধ কমছে না কেন? এর অন্যতম কারণ হিসেবে বলা যায় বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও আইনের কার্যকর প্রয়োগের ঘাটতি। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের এক যৌথ গবেষণায় নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ এবং প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় আসামিদের খালাস পাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। অপরাধের পর দ্রুত বিচার ও দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ায় আইন থাকার পরও অপরাধীদের মধ্যে অপরাধের ভয় তৈরি হচ্ছেনা। এ পরিস্থিতিতে শুধু কোনো ঘটনা ঘটার পর অভিযান বা গ্রেপ্তার করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। নারী ও শিশু নির্যাতনের প্রতিটি অভিযোগ দ্রুত তদন্তের আওতায় আনতে হবে। মামলার তদন্তে গাফিলতি, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহে দুর্বলতা কিংবা বিচারপ্রক্রিয়ায় অযথা বিলম্বের কারণ চিহ্নিত করে তা দূর করতে হবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভয়ভীতি বা সামাজিক চাপের কারণে মামলা থেকে সরে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি না হয়। শিশুদের প্রতি সহিংসতার ঘটনা অনেক সময় পরিচিত ব্যক্তি বা কাছের মানুষের মাধ্যমেও ঘটে, তাই পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্র, গণপরিবহণ ও জনসমাগমস্থলে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতেও কার্যকর নজরদারি বাড়াতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতন কোনো বিচ্ছিন্ন সামাজিক সমস্যা নয়; এটি আইনশৃঙ্খলা, বিচারব্যবস্থা, পারিবারিক পরিবেশ এবং সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গে একই সুতোয় গাঁথা। তাই প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগের কোন বিকল্প নেই।