বাগবিতণ্ডার জেরে এজলাস ছাড়লেন প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের বিচারপতিরা

নিজস্ব প্রতিবেদন | প্রকাশ: ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৩:৪০ পিএম
বাগবিতণ্ডার জেরে এজলাস ছাড়লেন প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের বিচারপতিরা

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনের মধ্যে বাগবিতণ্ডার ঘটনা ঘটেছে। এক আইনজীবীকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করার বিষয়কে কেন্দ্র করে এ তর্কাতর্কি হয়। একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের বিচারপতিরা এজলাস ছেড়ে চলে যান। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে এ ঘটনা ঘটে।

শুনানির একপর্যায়ে বার সভাপতি মাহবুব উদ্দিন খোকন প্রধান বিচারপতিকে বলেন, তিনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর থেকে আইনজীবীদের আয় কমে গেছে। এ মন্তব্যের পর প্রধান বিচারপতি পাল্টা প্রশ্ন করলে দুজনের মধ্যে কথাবার্তা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের বিচারপতিরা এজলাস ত্যাগ করেন।

আদালত থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি। তিনি জানান, এক আইনজীবীকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করার বিষয়টি নিয়ে প্রধান বিচারপতির কাছে তিনি তা মওকুফের আবেদন করেছিলেন। তার ভাষ্য, ওই আইনজীবী জুনিয়র হওয়ায় এত বড় অঙ্কের জরিমানা বেশি হয়ে গেছে।

খোকন বলেন, “আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর আসলে মামলা শুনানি করা যাচ্ছে না আগের মতো। এ কারণে ল’ইয়ারদের ইনকাম কমে গেছে। একজন জুনিয়র ল’ইয়ারকে ৫ লাখ টাকা কস্ট দেওয়াটা অনেক বেশি হয়ে গেছে। উনাকে মাফ করেন।”

তার বক্তব্য অনুযায়ী, জবাবে প্রধান বিচারপতি জানতে চান, তিনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরই কি আইনজীবীদের আয় কমে গেছে। এরপর আপিল বিভাগের বেঞ্চ সংখ্যা ও মামলার শুনানি নিয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন বার সভাপতি।

খোকন বলেন, আগে আপিল বিভাগে ১১ জন বিচারপতির তিনটি বেঞ্চ ছিল এবং তিনটি বেঞ্চেই মামলা শুনানি হতো। বর্তমানে একটি বেঞ্চ থাকায় কোনো মামলায় স্থগিতাদেশ হলে সেটির শুনানি পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যাচ্ছে। এমনকি চেম্বার জজের দেওয়া স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে শুনানির জন্য আবেদন করেও অনেক সময় দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

নিজের একটি মামলার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ওই মামলায় বিচারক দোষী সাব্যস্ত হলেও সর্বোচ্চ তিন মাসের সাজা হতে পারে। কিন্তু আপিল বিভাগে মামলাটি এক বছর ধরে স্থগিত রয়েছে। এ বিষয়ে চেম্বার জজের কাছে চারবার শুনানির অনুরোধ করেও তিনি শুনানি করতে পারেননি বলে জানান।

বার সভাপতি আরও বলেন, আপিল বিভাগে মামলার বিষয় মেনশন করার সুযোগ না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে মামলা কেন ওপর থেকে নিচে গেল বা কেন শুনানি হচ্ছে না, তা তুলে ধরার সুযোগও থাকছে না। এতে মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং আইনজীবীরাও মামলা পরিচালনার সুযোগ কম পাচ্ছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

খোকনের ভাষ্য, আইনজীবীদের প্রতিনিধি হিসেবে তাদের স্বার্থের বিষয়টি প্রধান বিচারপতির কাছে তুলে ধরা তার দায়িত্ব। তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতি তার বক্তব্যে প্রতিক্রিয়া দেখাবেন, এমনটি তিনি ভাবেননি। বিচারকের পদ রাগ বা অভিমানের ঊর্ধ্বে থাকা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এর আগে নিকাহ রেজিস্ট্রার নিয়োগ সংক্রান্ত একই ঘটনায় একাধিক রিট মামলা করায় তথ্য গোপন ও প্রতারণার অভিযোগে রিটকারী মোহাম্মদ নুর আলম এবং তার আইনজীবী সুফিয়া আহামেদকে ৫ লাখ টাকা করে মোট ১০ লাখ টাকা জরিমানা করেন আপিল বিভাগ।

জরিমানার অর্থ ৩০ দিনের মধ্যে ঢাকা শিশু হাসপাতালে জমা দিতে বলা হয়েছে। নুর আলমের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী মাহবুব উদ্দিন খোকন। অপর নিকাহ রেজিস্ট্রার মিজানুর রহমান মুরাদের পক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী অনীক আর হক, সিনিয়র আইনজীবী মো. শিশির মনির এবং আইনজীবী অমিত দাশ গুপ্ত।

এই জরিমানার বিষয়টি নিয়ে শুনানির সময়ই প্রধান বিচারপতি ও সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতির মধ্যে বাগবিতণ্ডার সূত্রপাত হয়। এরপর আপিল বিভাগের বিচারপতিরা এজলাস ত্যাগ করেন।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে