সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় বেহাল দশা বিরাজ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অধিকাংশ শিক্ষক উপজেলা ও জেলা সদরে বসবাস করায় বিদ্যালয়ে যাতায়াতেই তাদের বড় একটি সময় চলে যাচ্ছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে বিদ্যালয়ে উপস্থিত না হওয়া এবং ছুটির সময়ের আগেই বিদ্যালয় ত্যাগ করার অভিযোগ রয়েছে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সনজীব সরকারের একাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনে বিষয়টির বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) উপজেলার কয়েকটি বিদ্যালয় পরিদর্শনকালে সরকারি নির্ধারিত সময়ের আগেই বিদ্যালয় বন্ধ করে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার চিত্র দেখতে পান তিনি। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ইউএনও। এ সময় তার সাথে দিরাই উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষাকর্তকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
জানা গেছে, দিরাই উপজেলার ৯ টি ইউনিয়নের মধ্যে রাজানগর, চরনাচর, দিরাই স্বরমঙ্গল, করিমপুর ও ভাটিপাড়া ইউনিয়নে অংশিক সড়ক যোগাযোগ রয়েছে।নিয়টি ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রামই বর্ষায় দীপের মত হয়ে যায়। এখানে যোগাযোগের একমাত্র বাহন নৌকা। উপজেলার প্রত্যন্ত হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষক দিরাই উপজেলা সদর থেকে যাতায়াত করেন। কেউ নৌকায়, আবার কেউ সড়কপথে বিদ্যালয়ে যান। এ ছাড়া বেশ কিছু শিক্ষক সুনামগঞ্জ জেলা সদর থেকেও দিরাই উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে যাতায়াত করেন।
সকালে দিরাই উপজেলা সদর থেকে নৌকাযোগে জগদল, তাড়ল ও কুলঞ্জ ইউনিয়নের বিভিন্ন বিদ্যালয়ের উদ্দেশে রওনা হন অনেক শিক্ষক। আবার কেউ দিরাই বাসস্ট্যান্ড থেকে রাজানগর, চরনারচর, ভাটিপাড়া, করিমপুর ও দিরাই-সরমঙ্গল ইউনিয়নের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে যাতায়াত করেন। সুনামগঞ্জ শহরের হাজীপাড়া পয়েন্ট থেকেও অনেক শিক্ষক দিরাই উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে যাতায়াত করেন বলে জানা গেছে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, জেলা ও উপজেলা সদর থেকে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার জন্য শিক্ষকদের যে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়, তা বিদ্যালয়ে পাঠদানের সময়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনেক শিক্ষক নির্ধারিত সময়ের পর বিদ্যালয়ে উপস্থিত হন এবং ছুটির নির্ধারিত সময়ের আগেই বিদ্যালয় ত্যাগ করেন। বিশেষ করে হাওরপাড়ের প্রত্যন্ত বিদ্যালয়গুলোতে এ সমস্যা বেশি প্রকট।
বুধবার কয়েকটি বিদ্যালয় পরিদর্শনকালে দিরাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইউএনও সনজীব সরকার প্রথমে উজান বাউসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যান। সেখানে গিয়ে তিনি বিদ্যালয়টি নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ দেখতে পান। এ সময় বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী ইউএনওকে জানায়, শিক্ষকরা প্রতিদিন বেলা ৩টার দিকে বিদ্যালয় ছুটি দিয়ে চলে যান।
এর আগে চন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নাছনি-২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সন্তোষপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও নোয়াগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করেও একই ধরনের চিত্র দেখতে পান ইউএনও। এসব বিদ্যালয়েও সরকারি নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই তালা ঝুলিয়ে শিক্ষকরা চলে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়।
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ইউএনও সনজীব সরকার বলেন, ‘সরকার হাওরপাড়ের প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে আন্তরিক হলেও শিক্ষকদের সরকারি নিয়ম-নীতির প্রতি অবহেলা খুবই দুঃখজনক। আমি আশা করব, শিক্ষকরা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে আন্তরিক হবেন।’
দিরাই উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহোদয়সহ কয়েকটি বিদ্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে উজান বাউসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ কয়েকটি বিদ্যালয় নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ পাওয়া যায়। শিক্ষকদের দায়িত্বের এমন অবহেলা খুবই দুঃখজনক। তাদের বিরুদ্ধে সরকারি বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে একাধিক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অধিকাংশ শিক্ষক উপজেলা সদরে বসবাস করেন। প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়াতেই তাদের অনেক সময় চলে যায়। হাওরপাড়ের অধিকাংশ বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা সকাল ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে বিদ্যালয়ে আসেন এবং দুপুর আড়াইটা থেকে ৩টার মধ্যে চলে যান। ফলে সরকারি বিধি অনুযায়ী বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান হচ্ছে না।
অভিভাবকদের দাবি, প্রত্যন্ত হাওরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। বিদ্যালয় এলাকায় শিক্ষকদের থাকতে বাধ্য করতে হবে। যারা থাকতে চাননা তাদের শহরে বদলী করার দাবি জানান অভিভাবকরা। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের আগে বিদ্যালয় বন্ধ করার প্রবণতা বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।