পদোন্নতি নিয়ে পুলিশ বাহিনীতে ক্ষোভ বাড়ছে। অভিযোগ রয়েছে, দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যাদের রাজনৈতিক যোগাযোগ ও তদবির ভালো তারাই পদোন্নতি পাচ্ছে। তার বাইতে যোগ্যতাসম্পন্ন অনেকেরই পদোন্নতি মেলেনি। বরং একজনকে ডিঙ্গিয়ে অনায়াসে আরেক উচ্চপদে চলে যাচ্ছে। এক ব্যাচ রেখে পরের ব্যাচের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে। ফলে অনেক সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তাকেই এখন জুনিয়রের অধীনে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। মূলত বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির মাধ্যমেই সহকারী পুলিশ সুপার থেকে অতিরিক্ত ডিআইজি পর্যন্ত পদোন্নতি হয়ে থাকে। আর ডিআইজি থেকে অতিরিক্ত আইজিপি পর্যন্ত পদোন্নতি সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের মাধ্যমে হয়ে থাকে। আর নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের অর্থাৎ কনস্টেবল থেকে ইন্সপেক্টর পর্যন্ত পুলিশ সদস্যদের পদোন্নতি পুলিশ সদর দপ্তর থেকে হয়ে থাকে। ওসব পদোন্নতি কমিটির প্রধান হিসাবে থাকেন যথাক্রমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং পুলিশের আইজিপি। কিন্তু পদোন্নতির ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের আমলেও বিগত সরকারের মতো দক্ষতা ও যোগ্যতাকে গুরুত্ব না দিয়ে দলীয় আনুগত্যদের বেশি প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। যা পুলিশ বাহিনীর মধ্যে ক্ষোভ বাড়াচ্ছে। পুলিশ বাহিনী সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, পুলিশে পদোন্নতির ক্ষেত্রে পিএসসির মেধাক্রম, কর্মদক্ষতা, আচরণ, বিভাগীয় মামলা, দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগের বিষয় বিবেচনা করা হয়। তার বাইরে খতিয়ে দেখা হয় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও। বর্তমানে দেশের পুলিশ ক্যাডারে এএসপি ১ হাজার ২২২টি, অতিরিক্ত এসপি ১ হাজার ১টি, এসপি ৫৯৩টি, অতিরিক্ত ডিআইজি ২৪৬টি, ডিআইজি ১১৭টি ও অতিরিক্ত আইজিপি ২২টি মঞ্জুরিকৃত পদ আছে। বর্তমানে অতিরিক্ত আইজিপি গ্রেড-১ আছেন ২ জন, অতিরিক্ত আইজিপি ২১ জন, ডিআইজি ৭৮ জন, সুপারনিউমারারি ডিআইজি ২ জন, অতিরিক্ত ডিআইজি ১৬৩ জন, অতিরিক্ত ডিআইজি (চলতি দায়িত্ব) ১০ জন, সুপারনিউমারারি অতিরিক্ত ডিআইজি ১০৩ জন, এসপি ৪৬২ জন, সুপারনিউমারারি এসপি ৯২ জন, অতিরিক্ত এসপি ৮৭১ জন, এএসপি ৫৫৬ জন, শিক্ষানবিশ এএসপি ২৯০ জন, ইন্সপেক্টর (নিরস্ত্র) ৪ হাজার ৭২৯ জন, ইন্সপেক্টর (টিটি) ৯৮৪ জন, ইন্সপেক্টর (সশস্ত্র) ৮৩৬ জন, এসআই (নিরস্ত্র) ১৯ হাজার ২০৪ জন, সার্জেন্ট (শিক্ষানবিশ) ৮৫ জন, সার্জেন্ট ২ হাজার ২৫ জন, টিএসআই ৪৪৬ জন, এসআই (সশস্ত্র) ২০ হাজার ৬৩৮ জন, এটিএসআই ২ হাজার জন, এএসআই (সশস্ত্র) ৬ হাজার ৮৫৭ জন, নায়েক ৭ হাজার ২০ জন ও কনস্টেবল ১ লাখ ২৫ হাজার ৭৫০ জন সদস্য পুলিশ বাহিনীতে রয়েছে।
সূত্র জানায়, পুলিশ বাহিনীতে পদোন্নতির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়ম হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পদোন্নতির ক্ষেত্রে একজনকে ডিঙ্গিয়ে আরেকজন পদোন্নতি দেয়া এবং তদবিরের পাশাপাশি অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। বিগত সরকারের আমলে অন্যদের ডিঙ্গিয়ে বিসিএস ৭ম ব্যাচে ৫ জন কর্মকর্তার মধ্যে দুজন অতিরিক্ত আইজিপি হলেও একই ব্যাচের দুই কর্মকর্তা অবসরে যান ডিআইজি থেকেই। ৮ম ব্যাচেও একই অবস্থা ছিলো। ওই ব্যাচের কোনো কোনো কর্মকর্তা অবসরে গেছেন এসপি পদে থেকেই। আবার কেউ কেউ অতিরিক্ত ডিআইজি থেকে অবসরে গেছেন। এমনকি পিএসসির মেধা তালিকায় যে কর্মকর্তা এক নম্বরে ছিলো তারও পদোন্নতি হয়নি। পদোন্নতির ক্ষেত্রে একই দশা ছিলো পুলিশের ১২তম ব্যাচেও। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ওই ব্যাচের অনেকেরই পদোন্নতি হয়েছে। তবে পদোন্নতি বঞ্চিতদের মতে, রাজনৈতিক তদবিরসহ অন্য কারণে জোর না থাকায় তারা পদোন্নতি বঞ্চিত হচ্ছেন। তাদের চাকরির মেয়াদও শেষ হয়ে যাচ্ছে। এখনো ১৫তম ব্যাচের ১৫ জন পদোন্নতির অপেক্ষায় আছেন। তাছাড়া ১৭ ব্যাচেও একই কাণ্ড ঘটেছে। ওই ব্যাচে ৪৯ জন থাকলেও তাদের পিএসসির তালিকা ধরে পদোন্নতি হয়নি।
সূত্র আরো জানায়, পুলিশের ১৮তম ব্যাচের কর্মকর্তা ৫৫ জনের অনেকেই এখনো পদোন্নতি পায়নি। তাছাড়া ২০তম ব্যাচে কর্মকর্তা ১০৬ জন, ২১তম ব্যাচের ৪৯ জন, ২২তম ব্যাচের ৪২ জন, ২৪তম ব্যাচের ২০১ জন, ২৫তম ব্যাচের ১৯২ জন, ২৭তম ব্যাচের ১৩৭ জন, ২৮তম ব্যাচের ১৮০ জন, ২৯তম ব্যাচের ৩৫ জন, ৩০তম ব্যাচের ১৮৪ জন, ৩১তম ব্যাচের ১৮৩ জন, ৩৩তম ব্যাচের ১৫৫ জন, ৩৪তম ব্যাচের ১৪৭ জন, ৩৫তম ব্যাচের ১১৪ জন, ৩৬তম ব্যাচের ১১৩ জন, ৩৭তম ব্যাচের ৯৭ জন, ৩৮তম ব্যাচে ৯৭ জন কর্মকর্তা রয়েছে। তাদের অনেকেই এখনো পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত। পদোন্নতির ধারাবাহিকতা না থাকায় পুলিশ বাহিনীর অনেকেই এখন আর সিনিয়রদের স্যার বলেন না। কারণ তারা পদোন্নতি পেয়ে সিনিয়রদের উপরে চলে গেছেন। ফলে কোনো সম্বোধন ছাড়াই কোনো কোনো কর্মকর্তা দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, প্রতিটি সরকারের আমলেই তদবিরের পাশাপাশি রাজনৈতিক বিবেচনায় পদোন্নতি হয়। এখনো তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। বরং এখনো নিয়মের বাইরে গিয়ে আগের মতোই পদোন্নতি হচ্ছে। পদোন্নতির ক্ষেত্রে অনুসরণ করা হচ্ছে পিএসসির মেধাক্রম। যদিও ওই তালিকা ধরেই পদোন্নতি হওয়ার কথা। কিন্তু প্রতিটি ব্যাচেই একইভাবে পদন্নোতি দেয়া হচ্ছে। যদিও পদোন্নতিপ্রাপ্তদের মধ্যে কারো কারোর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে পদোন্নতি নিয়ে সুপারনিউমারারি এসপিসহ অন্য কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। তাদের আশঙ্কা, জুনিয়রদের আগে পদায়ন দেয়া হলে বাহিনীর চেইন অব কমান্ড থাকবে না।
অন্যদিকে বিগত ২০২২ সালে ২৮তম ব্যাচে ২৫ জন কর্মকর্তা এসপি পদে পদোন্নতি পায়। পরে ২০২৩ সালের নভেম্বরে একই ব্যাচের আরো ১০৩ জনসহ অন্যান্য ব্যাচ মিলিয়ে ১৫০ জন কর্মকর্তাকে সুপারনিউমারারি এসপি পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। বিভিন্ন সময়ে শূন্য পদের বিপরীতে ৮০ জন কর্মকর্তার নিয়মিত পদায়ন হলেও এখনো ওই ব্যাচের ৬০ জন কর্মকর্তা একই পদে রয়ে গেছেন। তারা নিয়মিত পদায়নের অপেক্ষায় দিন গুনছে। এসপিদের পাশাপাশি অতিরিক্ত ডিআইজিদের বেলায়ও একই অবস্থা। ইতিমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ৩০তম ব্যাচের পদোন্নতির প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে সেক্ষেত্রে শূন্য পদগুলোয় ২৮ ও ২৯তম ব্যাচের সুপারনিউমারারিদের আগে সমন্বয় করা প্রয়োজন। তারপর পদোন্নতির বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। সে ক্ষেত্রে প্রথমে সিনিয়রিটি বিবেচনা করলে আগে ২৮ ও ২৯-এর পর ৩০তম ব্যাচ আসবে। আর শূন্য পদের বিপরীতে পদোন্নতি হওয়া উচিত। তাহলেই বাহিনীতে শৃঙ্খলা থাকবে। কিন্তু দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশ প্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে উদ্যোগ নেয়া হলেও পুনর্গঠন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। আর বর্তমান সরকারের আমলেও কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। ফলে কাজের মূল্যায়নের মানদণ্ড নিয়েও ভেতরে-বাইরে নানা প্রশ্ন উঠছে। এমনকি প্রকৃত মূল্যায়ন ও স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে নতুন করে বিতর্কও তৈরি হচ্ছে। আর ওসব কারণে পুলিশ বাহিনী ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশে একশ্রেণির সুবিধাবাদী গোষ্ঠী সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তাদের খেয়ালখুশিতেই যাকে খুশি তাকে ওসি-এসপি পদে পদায়নের পাশাপাশি পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে আর যোগ্যরা বাদ পড়ছে।