কাগজে-কলমে পর্যাপ্ত বরাদ্দ এবং সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও কুড়িগ্রামের চিলমারীতে কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে চড়া দামে সার বিক্রির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ডিলারশিপের ওপর গুটিকয়েক ব্যক্তির একচ্ছত্র আধিপত্য, বেআইনিভাবে লাইসেন্স ভাড়া দেওয়া এবং বহিরাগতদের কাছে চড়া দামে সার পাচারের কারণে সাধারণ কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যানুযায়ী, চিলমারীর ৬টি ইউনিয়নের প্রায় ৩২ হাজার ১৫০ জন আমন চাষির জন্য চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ১,৮৪৯.৪৩ মেট্রিক টন সার (ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি) বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে-যা গত বছরের চেয়ে ৪০৮.৪৩ মেট্রিক টন বেশি।সরকারি নির্ধারিত মূল্য ইউরিয়া ও টিএসপি (৫০ কেজি) ১,৩৫০ টাকা, ডিএপি ১,০৫০ টাকা, এমওপি ১,০০০ টাকা। অথচ মাঠপর্যায়ের কৃষকদের অভিযোগ, স্থানীয় ডিলাররা "সার নেই" বলে হয়রানি করছেন এবং পরবর্তীতে প্রতি বস্তা ১,৭০০ থেকে ১,৮০০ টাকায় বিক্রি করছেন। এমনকি কৃষি অফিসের টোকেন প্রদর্শন ছাড়া সার না দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। উপজেলায় ১৭ জন নিবন্ধিত ডিলার থাকলেও পুরো সার বিতরণ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করছেন গুটিকয়েক প্রভাবশালী ব্যক্তি। রমনা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গওছল আজমের বিরুদ্ধে নিজস্ব লাইসেন্সসহ সাড়ে পাঁচটি ডিলারশিপ (মেসার্স সিরাজুল ইসলাম, রহমানীয় বীজ ভান্ডার, মেসার্স মো. মজিবর রহমান মঞ্জু, মো. রেজাউন্নবী যাঁহাগীর ও মেসার্স আব্দুল হাই রঞ্জু) একা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মেসার্স হাবিবুর রহমানের ডিলারশিপ লাইসেন্স ২০ লাখ টাকায় রাজু মণ্ডল কিনে নিলেও গওছল আজমের প্রভাবে সার উত্তোলন করতে পারছেন না। এ বিষয়ে আদালতে মামলা বিচারাধীন এবং কৃষি কর্মকর্তার তদন্ত প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতি রবিবার ও বুধবার জোড়গাছ হাটে রৌমারীর যাদুর চর ও শৌলমারীসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার ক্রেতারা এসে বস্তাপ্রতি ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা বেশি দিয়ে সার কিনে নিয়ে যান। তবে গত বুধবার স্থানীয় উপজেলা বিএনপি নেতাকর্মীদের কড়া নজরদারির কারণে বাইরের ক্রেতারা সার কিনতে পারেননি এবং স্থানীয় কৃষকরা নির্ধারিত মূল্যে সার সংগ্রহ করতে সক্ষম হন।অভিযোগ অস্বীকার করে গওছল আজম বলেন,‘লাইসেন্স হস্তান্তর যোগ্য নয়, কেউ যদি বলে থাকে আমি জানিনা। সার উত্তোলনে প্রভাবের বিষয়টি আদৌ সত্য নয়।’ তপু কুমার মহন্তও লাইসেন্স ভাড়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,‘আমি নিজেই সার তুলি, লিটন শুধু গোডাউন দেখাশোনা করে।’রেজাউন্নবী যাঁহাগীরের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। মেসার্স সিরাজুল ইসলামের স্বত্বাধিকারী আমিনুল ইসলাম দুলাল কোর্টে রয়েছেন জানিয়ে ফোন কেটে দেন।অন্যদিকে, সারের সংকটের বিষয়ে ডিলার সমিতির প্রতিনিধি আজাদুল ইসলাম দাবি করেন,‘কৃষি অফিস থেকে প্রকৃত চাহিদার সঠিক হিসাব না পাঠিয়ে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী চাহিদাপত্র দেয়, যার ফলে সরবরাহ কম হয়ে সংকট তৈরি হয়।রমনা পানাতিপাড়া এলাকার কৃষক কলিম উদ্দীন বলেন,‘ডিলারের কাছে সার চাইলে কৃষি অফিসের টোকেন ছাড়া সার দেওয়া হবে না বলে ফিরিয়ে দেন। পরে টোকেন নিয়ে সার কিনেছি।’থানাহাট ইউনিয়নের মাচাবান্দা ফকিরপাড়া এলাকার কৃষক রওশন আলী বলেন,‘ডিলাররা কৃষকদের সার নেই বলে হয়রানি করেন। সুযোগ বুঝে আবার বেশি দামে বাইরে সার বিক্রি করেন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কনক চন্দ্র বলেন,‘উপজেলায় সারের কোনো ঘাটতি নেই। ডিলাররা নিজ নামেই সার উত্তোলন ও ডিলারপয়েন্ট থেকেই বিতরণ করেন। তবে ডিলারদের মধ্যে সমন্বয় থাকতে পারে।কোন ডিলারের অনিয়ম পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।