সন্ত্রাস নির্মূলে সরকার কোনো বিচারবহির্ভূত বা ক্রসফায়ারের পথে হাঁটবে না বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টায় খুলনা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন। প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আইন প্রয়োগেই সর্বোচ্চ জোর। আইনমন্ত্রী বলেন, অপরাধ দমনে কোনো ক্রসফায়ারের মতো বিতর্কিত পথ বেছে নেওয়া হবে না।
অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে প্রয়োজনে বিদ্যমান প্রচলিত আইনগুলোকে আরও কঠোর ও যুগোপযোগী করা হবে। সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি জানান, পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে পরিকল্পিতভাবে মাদকের চালান চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
সীমান্তের ওপারে বসে ইয়াবা কারবারিরা নানা পরিকল্পনা তৈরি করছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে ড্রোনের মাধ্যমেও বিভিন্ন স্থানে মাদক সরবরাহ করা হচ্ছে। মাদক সংকট কেবল একটি অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এটি এখন গোটা দেশের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণে মাদক বিস্তার ঠেকাতে এখন সারাদেশে ডোপ টেস্টের ওপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বৈঠকে উপস্থিত কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পেশাদারিত্ব ও কঠোর নজরদারি বজায় রাখার নির্দেশ দেন।
খুলনার রূপসা ঘাটে নদী পারাপারে টোলে অতিরিক্ত টাকা আদায় ও চাঁদাবাজির অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করে তাৎক্ষণিকভাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার নির্দেশ দেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, ঘাটে গুটিকয়েক রাজনৈতিক বা ক্ষমতাধর ব্যক্তির স্বার্থ রক্ষায় সরকার কোনো বদনাম নিজের ঘাড়ে নেবে না। এমনকি তার দলের কেউ জড়িত থাকলেও ছাড় দেওয়া হবে না। তবু জনগণকে কোনোভাবেই দুর্ভোগ দেওয়া যাবে না।
জামিন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিচার বিভাগ স্বাধীন এবং সরকার বিচার বিভাগের কাজে হস্তক্ষেপ করতে চায় না। কাউকে জামিন দেওয়া বা না দেওয়ার জন্য টেলিফোন করা হলে সেটি বিচার বিভাগে হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে থেকে জামিনের বিরোধিতা করার ক্ষেত্রে সরকারি কৌঁসুলিরা প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করবেন।
সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কোনো মামলায় পাবলিক প্রসিকিউটরের কার্যালয় মৃদু আপত্তি তুললে বা আপত্তি না তুললে সাংবাদিকরা তথ্য দিয়ে নিউজ করবেন। মন্ত্রী ও এমপিদের কেউ সুশাসনবিরোধী কোনো কাজে জড়িত থাকলে সাংবাদিকরা সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে প্রতিবেদন করবেন। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস করা হবে না। আমরা মুক্ত বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাস করি।
সাইবার আইন সংশোধনের উদ্যোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তথ্য, মিথ্যা তথ্য, বিভ্রান্তিকর তথ্য, অপতথ্য ও মানহানিকর তথ্য নিয়ে আইনি বিধান আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে প্রধানমন্ত্রী বাকস্বাধীনতার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে আইনটি আরও যাচাই-বাছাই এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করার নির্দেশ দিয়েছেন। এ বিষয়ে গঠিত কমিটি ইতোমধ্যে সম্পাদকদের সঙ্গে বৈঠক করেছে এবং পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়া হবে।
সভায় খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও সরকারদলীয় হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল, খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য আজিজুল বারী হেলাল, খুলনা-১ আসনের সংসদ সদস্য আমীর এজাজ খান, বিভাগীয় কমিশনার আবদুল্লাহ হারুন, খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার সাজ্জাদুর রহমান, খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মোস্তাফিজুর রহমান, খুলনার পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক, খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান শফিকুল আলম মনা, খুলনা ওয়াসার চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান মনি ও খুলনা জেলা পরিষদের প্রশাসক মনিরুল ইসলাম বাপ্পিসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা খুলনা জেলার উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড, নাগরিক সেবা সম্প্রসারণ এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরেন।
এর আগে সকাল ৯ টায় খুলনা জেলা জজ আদালতের সম্মেলন কক্ষে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন আইনমন্ত্রী। জেলা ও দায়রা জজ চান মোহাম্মদ আব্দুল আলীম আল রাজীসহ অন্যান্য বিচারকদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ওই সভায় মন্ত্রী মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করে আদালতের জট কমানোর আহ্বান জানান।