বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্র ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। আসকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই শত শত নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে অনেকেই হত্যার শিকার। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, বরং সমাজের গভীর সংকটের প্রতিফলন। প্রতিদিন নতুন মামলা যুক্ত হচ্ছে, কিন্তু বিচারাধীন মামলার সংখ্যা হাজার হাজারে পৌঁছেছে। এর অর্থ হলো, ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পেতে দীর্ঘসূত্রতার শিকার হচ্ছেন। নারী ও শিশু সুরক্ষায় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সেবা থাকলেও সেগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব প্রকট। আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, মনোসামাজিক সহায়তা, আশ্রয় ও পুনর্বাসন-সবই বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে ভুক্তভোগীদের এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে ছুটতে হয়, সময় ও অর্থ ব্যয় হয়, আর ন্যায়বিচার আরও দূরে সরে যায়। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় মানুষ এসব সেবা সম্পর্কে কম জানেন। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, ইন্টারনেটের অভাব এবং সচেতনতার ঘাটতির কারণে অনলাইন আবেদন ও হেল্পলাইনও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। আইনি সহায়তা পাওয়ার প্রক্রিয়া জটিল ও সময়সাপেক্ষ। আবেদনকারীদের একাধিক অনুমোদনের ধাপ অতিক্রম করতে হয়। অনুমোদনকারী কমিটি নিয়মিত সভা না করায় আবেদন নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হয়। আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে আপিলের ব্যবস্থা অনেকের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। অসচ্ছল বিচারপ্রার্থীদের পক্ষে এই ব্যয় বহন করা প্রায় অসম্ভব। ফলে তারা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। নারী ও শিশুদের জন্য দেশে ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) থাকলেও সেগুলোতে সমন্বিত সেবা নিশ্চিত করা যায়নি। অনেক কেন্দ্রে ২৪ ঘণ্টা সেবা নেই, ফরেনসিক সুবিধা নেই, কাউন্সেলিংয়ের জায়গা নেই। ফলে ভুক্তভোগীরা পূর্ণাঙ্গ সহায়তা পান না। আমরা মনে করি, নারী ও শিশু সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হলে আইনি সহায়তা ব্যবস্থার সংস্কার জরুরি। আবেদন প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে, প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং গ্রামীণ এলাকায় সচেতনতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সমন্বিত সেবা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যাতে ভুক্তভোগীরা এক জায়গা থেকেই চিকিৎসা, আইনি সহায়তা ও পুনর্বাসন পান। নারী ও শিশু নির্যাতন শুধু আইনি সমস্যা নয়, এটি সামাজিক সংকটও। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো ছাড়া এ সংকট নিরসন সম্ভব নয়।