রাজধানীর ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাট থেকে দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা হয়েছে। নিহতের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহর করা মামলায় গাজী নজরুল ও মাকছুদার বিরুদ্ধে মেয়েকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলায় মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকেও আসামি করা হয়েছে।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় সংসদ ভবনের বিপরীত পাশে ৫ নম্বর ন্যাম ভবনের তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে ১৯ বছর বয়সী মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকে পুলিশ হেফাজতে নেয়। সোমবার মাকছুদাকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। সংসদ সদস্য গাজী নজরুলকেও নিয়ম মেনে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার ফজলুল করিম বলেন, “সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামও এই মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। সংসদ সদস্য হওয়ায় তার গ্রেপ্তারের বিষয়ে কিছু নিয়ম-কানুন রয়েছে। সেসব নিয়মকানুন মেনে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হবে।”
এজাহারে নির্যাতনের অভিযোগ
মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ এজাহারে অভিযোগ করেন, গত জুনে তার শ্যালক ওবায়দুর রহমানের প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে তার বড় মেয়ে মরিয়মের বিয়ে হয়। বিয়ের পর মরিয়ম সংসদ ভবনের বিপরীতে ন্যাম ভবনের ২০৩ নম্বর বাসায় গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদার সঙ্গে থাকতেন।
এজাহারে বলা হয়েছে, বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গাজী নজরুল ও মাকছুদা মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন বলে তিনি পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছিলেন।
নিহতের বাবার অভিযোগ, রোববার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে গাজী নজরুল ফোন করে তাকে দ্রুত বাসায় যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে তিনি মেয়েকে গলায় ফাঁস দেওয়া অবস্থায় দেখতে পান।
পুলিশ জানিয়েছে, মরিয়ম যে কক্ষে থাকতেন, সেখান থেকে তার লেখা কয়েকটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের এডিসি ফজলুল করিম বলেন, “মরিয়ম যে রুমে থাকতো, সে রুম থেকে তার লেখা কিছু চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে।”
চিরকুটে সম্পর্কের টানাপোড়েনের ইঙ্গিত
মামলার এজাহারে মরিয়মের লেখা বলে উল্লেখ করা কয়েকটি চিরকুটের কথাও রয়েছে। একটি চিরকুটে লেখা ছিল, “শুধু মায়ায় পড়েছি বলে বারবার তোমার কাছে নত হই… তা না হলে যতটা সস্তা ভাবছো ততটা সস্তা আমি নই।”
আরেকটি চিরকুটে সম্পর্কের টানাপোড়েন ও প্রতারণার অভিযোগের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সেখানে লেখা ছিল, “আমি অতি বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিলাম তার সাথে, জিততে পারিনি হেরে গেলাম ময়দানে।”
ওই চিরকুটের শেষ দিকে আরও লেখা ছিল, “আমি ধ্বংসের শেষ দাঁড়িয়েও মুখে হাসি রেখেছি। ভেবে নাও এই হাসির কারণই হবে তোমার ধ্বংসের কারণ।”
আরেকটি চিরকুটে মরিয়ম লিখেছেন, “সে ছিলো অন্য নারীর স্বামী। কাগজে কলমে অধিকার ছিল তার বউ এর…!!! আর আমি ছিলাম বোকা…!!!”
এ ছাড়া ভালোবাসা ভাগ করে নেওয়া নিয়ে তার লেখা ছিল, “কাউকে অর্ধেক পাওয়ার চেয়ে হারিয়ে ফেলা বেশির সম্মানের। কারণ ভালোবাসা কখনোই ভাগ করে নেওয়ার বিষয় নয়… ভালোবাসা হয় সম্পূর্ণ, না হয় অপূর্ণ!”
চিরকুটগুলোর বক্তব্য ও মৃত্যুর সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্তের বিষয়। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে এবং মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।
মরিয়মের ফোন ব্যবহারের সুযোগ ছিল না, দাবি পুলিশের
পুলিশ কর্মকর্তা ফজলুল করিম জানান, মরিয়মের নিজের কোনো ফোন ছিল না। তাকে ফোন ব্যবহার করতে দেওয়া হতো না বলেও তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
মরিয়মের মৃত্যু নিয়ে পুলিশ ইতোমধ্যে ঘটনাস্থলের আলামত সংগ্রহ করেছে। মরদেহের ময়নাতদন্তও করা হচ্ছে। আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগের পাশাপাশি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও এর সঙ্গে আসামিদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
জুলাইয়ে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর আলোচনায়
মরিয়মের মৃত্যুর আগে জুলাই মাসে গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে আরেকটি ঘটনা ব্যাপক আলোচনায় আসে। ঢাকার মগবাজারের একটি হোটেলে মরিয়মের সঙ্গে তার অন্তরঙ্গ মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের কেউ কেউ সেটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি বলে দাবি করেছিলেন। পরে গাজী নজরুল নিজেই ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে ওই নারীকে তার দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন।
ওই পোস্টে তিনি দাবি করেন, ১৩ জুলাই তিনি প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রী মাকছুদা বেগম ও মরিয়ম বেগমকে নিয়ে মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহর ব্যবসায়িক কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে তাদের জিম্মি করে টাকা আদায় এবং পরে গাড়ি আটকে রেখে অর্থ দাবি করারও অভিযোগ তোলেন তিনি।
গাজী নজরুল আরও দাবি করেছিলেন, মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহর সঙ্গে ওবায়দুরের পূর্বশত্রুতা ও পারিবারিক বিরোধের জের ধরে ওই ঘটনা ঘটানো হয়েছিল।
ওই ভিডিওকাণ্ডের পর গাজী নজরুল ইসলামকে জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কার করা হয়।
মামলায় এখন তদন্তের দিকে নজর
মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় অভিযোগগুলো এখন তদন্তাধীন। পুলিশের পক্ষ থেকে গাজী নজরুল ও মাকছুদাকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং মামলার পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার প্রস্তুতির কথা জানানো হয়েছে। পুলিশ এরই মধ্যে মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
তবে এজাহারে আনা নির্যাতন ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। তদন্তে পাওয়া আলামত, চিরকুট, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের ভিত্তিতেই ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারিত হবে।