বাসের পর বাড়ল লঞ্চ ভাড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:০১ পিএম
বাসের পর বাড়ল লঞ্চ ভাড়া
ছবি: সংগ্রহীত

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর এবার যাত্রীবাহী লঞ্চের ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। প্রথম ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া বেড়েছে ২৩ পয়সা। ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে ২০ পয়সা। একই সঙ্গে সর্বনিম্ন লঞ্চ ভাড়া ৩২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৫ টাকা করা হয়েছে।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে লঞ্চ মালিকদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে সড়ক ও নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়টি জানান। নতুন ভাড়া বুধবার থেকেই কার্যকর হবে বলে জানিয়েছেন লঞ্চ মালিকদের প্রতিনিধিরা।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রথম ১০০ কিলোমিটার দূরত্বে যাত্রীপ্রতি কিলোমিটার ভাড়া ২ টাকা ৯৫ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ৩ টাকা ১৮ পয়সা। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া বেড়েছে ২৩ পয়সা।

১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটার ভাড়া ২ টাকা ৫২ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ২ টাকা ৭২ পয়সা। এ ক্ষেত্রে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া বেড়েছে ২০ পয়সা।

মন্ত্রী জানান, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর নৌযানের মালিক, মালিক সমিতি ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। বৈঠকে জ্বালানি ব্যয়ের পাশাপাশি নৌযানের ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, ডলারের দাম বৃদ্ধি এবং যন্ত্রাংশের মূল্য বাড়ার বিষয়গুলো তুলে ধরেন মালিকরা।

লঞ্চ মালিকরা ভাড়া বাড়ানোর দাবি জানালেও যাত্রীদের ওপর চাপ কম রাখার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে জানান শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেন, মালিকদের পক্ষ থেকে প্রায় ১৫ শতাংশ ভাড়া বাড়ানোর দাবি ছিল। শেষ পর্যন্ত দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে ১৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ। এর বিপরীতে যাত্রীদের সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে লঞ্চ ভাড়া ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এর আগে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জ্বালানি তেলের দাম ১৫ শতাংশ বাড়লেও নৌযানের ভাড়া প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল।

শেখ রবিউল আলম বলেন, জনগণের ওপর যেন খুব বেশি চাপ না পড়ে এবং মালিকদের প্রয়োজনীয় ব্যয়ও যেন কিছুটা সমন্বয় করা যায়, সেই ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। তেলের দাম বাড়ার সুযোগ নিয়ে মালিকরা যেন স্বেচ্ছাচারীভাবে ভাড়া বাড়াতে না পারেন, সেটিও সরকার দেখেছে বলে জানান তিনি।

সর্বনিম্ন ভাড়ার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে সর্বনিম্ন ভাড়া ছিল ৩২ টাকা, এখন তা ৩৫ টাকা। সর্বনিম্ন দূরত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ কিলোমিটার। এরপর দূরত্ব অনুযায়ী ভাড়া সমন্বয় হবে।

নৌপথের ভাড়া বাড়ানোর যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে মন্ত্রী বলেন, সড়ক ও নৌপথের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং যাত্রার ধরন এক নয়। নৌপথে সর্বনিম্ন ১০ কিলোমিটার দূরত্ব বিবেচনায় ৩২ টাকা থেকে ৩৫ টাকা সর্বনিম্ন ভাড়া করা অযৌক্তিক নয়।

লঞ্চ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন (যাপ) সংস্থার সভাপতি গোলাম নবী আলমগীর বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির কারণে লঞ্চ মালিকরা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন। সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর নতুন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রথম ১০০ কিলোমিটারে কিলোমিটারপ্রতি ২৩ পয়সা এবং এরপরের দূরত্বে ২০ পয়সা ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। মালিকদের পক্ষ থেকে আরও বেশি ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব থাকলেও দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারের অনুরোধে নির্ধারিত ভাড়া মেনে নেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর লঞ্চ মালিকরা এর আগে আরও বড় ধরনের ভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তাদের দেওয়া প্রস্তাবে প্রথম ১০০ কিলোমিটারে প্রতি কিলোমিটার ভাড়া ২ টাকা ৯৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪ টাকা ৪৫ পয়সা এবং পরবর্তী প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৫২ পয়সা থেকে ৪ টাকা ২ পয়সা করার কথা বলা হয়েছিল। অর্থাৎ তারা বর্তমান হারের তুলনায় ৫১ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানোর দাবি জানিয়েছিলেন। বিকল্প হিসেবে জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম প্রত্যাহারের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল।

তবে আলোচনার পর সেই প্রস্তাব অনুযায়ী ভাড়া বাড়ানো হয়নি। সরকার ও মালিকপক্ষের বৈঠকে ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ হারে ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

লঞ্চের পাশাপাশি রেলের ভাড়া বাড়ানোর বিষয়েও কথা বলেন নৌপরিবহন মন্ত্রী। তিনি জানান, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও এখন পর্যন্ত রেলের ভাড়া বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। গতবার ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়ার পরও রেলের ভাড়া বাড়ানো হয়নি। এবারও ভাড়া না বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

ফেরির ভাড়াও আপাতত বাড়ানোর উদ্যোগ নেই বলে জানান শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেন, ফেরিতে লোকসান হলেও জনস্বার্থে ভাড়া না বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা একেবারে অসম্ভব হয়ে পড়লে যৌক্তিকভাবে ভাড়া সমন্বয় করা হতে পারে।

এর আগে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে সড়কপথের বাস ও মিনিবাসের ভাড়াও বাড়ানো হয়েছে। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দূরপাল্লা এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ শহরাঞ্চলের বাসে প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা করে ভাড়া বাড়ানো হয়।

এর আগে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে বাসের ভাড়া ছিল কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ৫৩ পয়সা। মিনিবাসের ভাড়া ছিল ২ টাকা ৪২ পয়সা। দূরপাল্লার ৫২ আসনের বাসে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ছিল ২ টাকা ২৩ পয়সা। নতুন ১৭ পয়সা বৃদ্ধির পর বাসের ভাড়া নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে।

লঞ্চের নতুন ভাড়ার চার্ট গেজেট হওয়ার পর তৈরি করা হবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী। বর্তমানে প্রতিটি লঞ্চে যে ভাড়ার চার্ট রয়েছে, নতুন ভাড়া অনুযায়ী তা হালনাগাদ করা হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে