১০৩ এনওসি বাতিল, ভারত থেকে ইলিশ আমদানি বন্ধ

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:০৫ পিএম
১০৩ এনওসি বাতিল, ভারত থেকে ইলিশ আমদানি বন্ধ
ছবি: সংগ্রহীত

ভারত থেকে বাংলাদেশে ইলিশ আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে। মৎস্য অধিদপ্তরের দেওয়া ১০৩টি অনাপত্তি সনদ বা এনওসি বাতিলের পর এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। এতে ভারতীয় অংশে ইলিশ কেনা ও আমদানির প্রস্তুতি নেওয়া ব্যবসায়ীরা নতুন করে আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায় পড়েছেন।

মৎস্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনকের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) ১০৩টি অনাপত্তি সনদ বাতিলের কথা জানানো হয়। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) থেকে আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। বেনাপোল স্থলবন্দরেও ভারতীয় ইলিশের সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।

হঠাৎ করে এনওসি বাতিলের নির্দিষ্ট কারণ মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়নি। তবে সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ ধারণা করছেন, আমদানি করা ভারতীয় ইলিশকে দেশীয় বা পদ্মার ইলিশ হিসেবে বিক্রি করে ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা, কম মূল্য দেখিয়ে আমদানির মাধ্যমে অর্থ পাচারের সম্ভাবনা এবং দেশীয় ইলিশ উৎপাদনে আগ্রহ বাড়ানোর বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে থাকতে পারে। এগুলো সংশ্লিষ্টদের ধারণা, কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কারণ নয়।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশে ১ হাজার ৭৩৯ দশমিক ৫০ টন ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ৫৩৫ মেট্রিক টন ইলিশ আমদানি হয়েছে।

বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানান, তুলনামূলক বেশি লাভের আশায় সাম্প্রতিক সময়ে ভারত থেকে ইলিশ আমদানি বেড়েছিল। আমদানির সময় প্রতি কেজি ইলিশের মূল্য ৪৮ সেন্ট থেকে ২ মার্কিন ডলার পর্যন্ত দেখানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। নির্ধারিত রাজস্ব পরিশোধের পর এসব মাছ বন্দর থেকে ছাড় করা হয়েছে।

এদিকে আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। কয়েকজন আমদানিকারক ইতোমধ্যে ভারতীয় অংশে ইলিশ কেনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছিলেন। কেউ কেউ মাছ কেনার জন্য অর্থও বিনিয়োগ করেছেন। এখন আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কেনা মাছ কম দামে ফেরত দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন।

বেনাপোল আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মতিয়ার রহমান বলেন, ইলিশ আমদানির জন্য ব্যবসায়ীরা আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। এনওসি পাওয়ার পর ভারতীয় অংশে মাছ কেনাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়। এখন হঠাৎ করে সনদ বাতিল হওয়ায় আমদানিকারকেরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

তিনি বলেন, কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অনুমোদনের ভিত্তিতে যারা ইলিশ কেনার প্রস্তুতি নিয়েছেন বা ইতোমধ্যে মাছ কিনেছেন, তাদের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। আমদানি বন্ধ হওয়ায় তাদের বিনিয়োগ আটকে যাচ্ছে এবং ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

বেনাপোল আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান জিয়া বলেন, মৎস্য অধিদপ্তরের চিঠিতে অনেকগুলো অনাপত্তি সনদ বাতিলের কথা জানানো হয়েছে। সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পর ভারত থেকে ইলিশ আমদানির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এতে ইলিশ আমদানির সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

ইলিশ আমদানিকারক সৈয়দ মহিদুল হক রুবাই বলেন, হঠাৎ করে আমদানি বন্ধ হওয়ায় তারা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। আমদানির উদ্দেশ্যে ভারতীয় অংশে কেনা ইলিশ রাখা হয়েছিল। এখন সেগুলো কম দামে ফেরত দিতে হতে পারে। এর সঙ্গে আমদানি ও পরিবহনসহ অন্যান্য খরচের লোকসানও রয়েছে।

আরেক আমদানিকারক রফিকউল্লাহ বলেন, অনুমোদন পাওয়ার পর ব্যবসায়ীরা ভারতীয় অংশে ইলিশ কেনার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। অনেকে ইতোমধ্যে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। এখন সময়মতো মাছ বাংলাদেশে আনতে না পারলে কম দামে ফেরত দিতে হবে। এতে মাছের দামের পাশাপাশি পরিবহন ও অন্যান্য খরচও লোকসানে পরিণত হবে।

বেনাপোলের মৎস্য ও মান নিয়ন্ত্রণ অফিসের পরিদর্শক আসাওয়াদুল ইসলাম বলেন, মৎস্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় ইলিশ আমদানি বন্ধ রাখা হয়েছে। আমদানি বন্ধ হওয়ায় বেনাপোলের বাজারে ভারতীয় ইলিশের সরবরাহও বন্ধ রয়েছে।

এদিকে ভারতীয় ইলিশের বাজারজাত নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে। যশোর শহরের বেজপাড়ার ক্রেতা রফিকুল ইসলাম বলেন, আমদানিকৃত ভারতীয় ইলিশ দেখতে অনেকটা বাংলাদেশের পদ্মার ইলিশের মতো হওয়ায় সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। স্বাদে পার্থক্য থাকলেও বাহ্যিক মিলের কারণে কেউ কেউ দেশি ইলিশ ভেবে ভারতীয় ইলিশ কিনছেন।

তিনি বলেন, তুলনামূলক কম দামে আমদানি করা ইলিশও বাজারে আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। এরই মধ্যে জেলা প্রশাসন বাজার তদারকির সময় চড়া দামে ভারতীয় ইলিশ বিক্রির অভিযোগে কয়েকজন বিক্রেতাকে জরিমানাও করেছে।

সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আরও আশঙ্কা রয়েছে, বাজারে ভারতীয় ইলিশের সরবরাহ বাড়লে দেশীয় ইলিশ আহরণে জেলেদের আগ্রহ কমে যেতে পারে। পাশাপাশি বাজারমূল্যের তুলনায় কম মূল্য দেখিয়ে ইলিশ আমদানি করা হলে ‘আন্ডার ইনভয়েসিং’-এর মাধ্যমে অর্থ পাচারের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন।

এ কারণে এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সরকার ইলিশ আমদানি নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। তবে ১০৩টি এনওসি বাতিলের আনুষ্ঠানিক কারণ হিসেবে মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

আমদানি বন্ধ হওয়ায় শুধু আমদানিকারকরাই নন, পরিবহন, কাস্টমস ক্লিয়ারিংসহ ইলিশ আমদানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যবসাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।

এখন বাতিল হওয়া ১০৩টি অনাপত্তি সনদের পর অবশিষ্ট অনুমোদনের আওতায় ইলিশ আমদানি করা যাবে কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে