ডোপ টেস্ট আতঙ্কে ভুগছে মাদকাসক্ত পুলিশ সদস্যরা

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:১৫ এএম
ডোপ টেস্ট আতঙ্কে ভুগছে মাদকাসক্ত পুলিশ সদস্যরা

পুলিশ বাহিনীর মাদকাসক্ত সদস্যরা এখন ডোপ টেস্ট আতঙ্কে ভুগছে। কারণ ডোপ টেস্টে কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বা সদস্য শনাক্ত হলেই তাকে চাকরিচ্যুত করা হবে। বিগত ২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত দেশে ১৬৫ জনের বেশি পুলিশ সদস্যকে  মাদক সম্পৃক্ততায় বিভাগীয় শাস্তি আওতায় আনা হয়েছে। বর্তমানে মাদক সেবনের পাশাপাশি বিভিন্ন সময় চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত সন্দেহভাজন অনেক পুলিশ সদস্যকেই নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে। তার মধ্যে ডোপ টেস্টে মাদকাসক্তির বিষয় শনাক্ত হলেই করা হচ্ছে চাকরিচ্যুত। পুলিশ সদর দপ্তর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, পুলিশ বাহিনীর কিছু সদস্যের মাদক সেবন পুরনো বিষয় হলেও সমপ্রতি একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ডোপ টেস্টের ফল পজিটিভ আসায় শুরু হয়েছে তোলপাড়। তারপরই পুলিশ সদর দপ্তর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এ ব্যাপারে দেশের সব জেলার এসপিদের বিশেষ নির্দেশ দিয়েছে। তারপর থেকেই আতঙ্কে রয়েছে অনেক পুলিশ সদস্য। ইতিপূর্বে ডোপ টেস্ট বা মাদক পরীক্ষায় শনাক্ত বা শাস্তি পাওয়া সবাই কনস্টেবল থেকে পরিদর্শক পদমর্যাদার পুলিশ সদস্য ছিলো। কিন্তু প্রথমবারের মতো এসপি পর্যায়ের একজন পুলিশ কর্মকর্তা শনাক্ত হলো। বর্তমানে পুলিশ বাহিনীতে কনস্টেবল থেকে পরিদর্শক পর্যন্ত পদ নন-ক্যাডার হলেও এএসপি থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিসিএস ক্যাডারভুক্ত। যদিও নন-ক্যাডার থেকে পদোন্নতি পেয়েও কেউ কেউ এএসপি বা অ্যাডিশনাল এসপি হন। 

সূত্র জানায়, মাদকের বিরুদ্ধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। ইতিমধ্যে  মাদকাসক্তির পরীক্ষায় ধরা পড়ে চাকরিচ্যুত হয়েছে অনেক পুলিশ সদস্য। বদনাম ঘোচাতে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে পুলিশ। ডিএমপি সদস্যদের মাদকমুক্ত রাখতে ২০২০ সালে ডোপ টেস্ট শনাক্তকরণ কার্যক্রম শুরু হয়। আর ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত ১২০ পুলিশ সদস্যের শরীরে মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। তবে ২০২৩ সালে ওই সংখ্যা দাঁড়ায় ১২ জনে দাঁড়ালেও ২০২৪ সাল পর্যন্ত শনাক্তের সংখ্যা বেড়ে ১৩৪ জনে দাঁড়িয়েছে। তার মধ্যে ৯৮ জনই কনস্টেবল। মাদকমুক্ত পুলিশ বাহিনী গড়তে মুন্সিগঞ্জের তৎকালীন পুলিশ সুপার বিগত ২০১৮ সালে ব্যক্তিগত উদ্যোগে পুলিশে ডোপ টেস্ট শুরু করেন। তারপর থেকেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে মাদকমুক্ত বাহিনী হিসাবে গড়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ফলে তিন দফায় ডোপ টেস্টের মাধ্যমে পজিটিভ রিপোর্ট এলে মাদক সেবন শনাক্ত হওয়া পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে চাকরিচ্যুতিসহ বিভিন্ন বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়। এভাবে শুরুতেই ২৫ জন পুলিশ সদস্যকে চাকরিচ্যুত করা হয়।

সূত্র আরো জানায়, রাজারবাগ ব্যারাকে থাকা কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিগত ২০১৯ সালে মাদক সেবন ও মাদক বিক্রির অভিযোগ ওঠে। তারপরই সন্দেহভাজন পুলিশ সদস্যদের শনাক্ত করে রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে পরীক্ষা করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তার আগে ডিএমপির প্রতিটি বিভাগে চিঠি দিয়ে সন্দেহভাজন মাদকাসক্ত পুলিশ সদস্যদের তালিকা করা হয়। সন্দেহভাজন পুলিশ সদস্যদের ডোপ টেস্টের আগে প্রথমে সন্দেহভাজনদের স্যাম্পল কালেকশন করা হয়। পরে ওই স্যাম্পল ডোপ টেস্ট মেশিনে দেয়া হয়। তাতেই ধরা পড়ে পুলিশ সদস্য মাদকাসক্ত কিনা। বিভিন্ন সময়ে পুলিশ হাসপাতালে এভাবে আড়াই হাজারের বেশি পুলিশ সদস্যকে ডোপ টেস্টের আওতায় আনা হয়। তার মধ্যে বেশির ভাগই ছিলো ফেনসিডিলসেবী। আবার তাদের মধ্যে কেউ কেউ ইয়াবায় আসক্ত। তাছাড়া অনেক পুলিশ সদস্যেরই মদ ও গাঁজায় আসক্তি রয়েছে।

এদিকে পুলিশ সদস্যদের মতে, মাদকমুক্ত পুলিশ বাহিনী গড়তে ডোপ টেস্ট ভালো উদ্যোগ হলেও এতোদিন এএসপি থেকে ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তাকে ওই পরীক্ষার আওতায় আনা হয়নি। পুলিশ বিভাগে ডোপ টেস্ট চালুর পর শুধু নন-ক্যাডারদের তালিকা করে পরীক্ষা করা হয়েছে। রহস্যজনকভাবে ওই তালিকায় ক্যাডার সদস্যদের নাম আসেনি। অথচ সব পুলিশ সদস্যের জন্য একই নিয়ম হওয়া প্রয়োজন।

এদিকে এ প্রসঙ্গে ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ জানান, গত ২০২৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১৭ জন পুলিশ সদস্যের ডোপ টেস্টে ফল পজিটিভ এসেছে। তার মধ্যে ১৫ জন কনস্টেবল, একজন সহকারী উপ-পরিদর্শক ও একজন নায়েক রয়েছে। 

অন্যদিকে এ ব্যাপারে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির জানান, মাদকে জড়ালে পুলিশকেও ছাড় দেয়া হবে না। ডোপ টেস্টের আওতায় মাদকাসক্ত পুলিশ সদস্যদের আনা হচ্ছে।