দেশে অ্যানথ্রাক্স ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা বাড়ছে। অ্যানথ্রাক্স মূলত গবাদিপশুবাহিত রোগ। ওই রোগে আক্রান্ত পশুর রক্ত, মাংস, চামড়া বা মৃতদেহের সংস্পর্শে এলে মানুষের মধ্যে তা সংক্রমণ হতে পারে। আর দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসা না হলে তা হয়ে উঠতে পারে গুরুতর। গত দুই মাসে দেশের ৫ জেলায় শতাধিক মানুষ অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হওয়ার খবর মিলেছে। এমন পরিস্থিতিতে অ্যানথ্রাক্সের বিস্তার রোধে আক্রান্ত পশু জবাই ও মাংস বিক্রি না করা, অসুস্থ বা মৃত পশুর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া জরুরি। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এবং স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, অ্যানথ্রাক্স দেশে নতুন কোনো রোগ নয়। বরং দেশের উত্তরাঞ্চলে দীর্ঘদিনের একটি স্থানীয়ভাবে বিদ্যমান রোগ। সেজন্য বিগত ২০১৯ সালে আগের প্রাদুর্ভাবের ভিত্তিতে সিরাজগঞ্জ, পাবনা, মেহেরপুর, টাঙ্গাইল ও রাজশাহী জেলার ৯টি উপজেলায় সক্রিয় নজরদারি শুরু করা হয়। আর নজরদারি তথ্যানুযায়ী মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে অ্যানথ্রাক্সের রোগী শনাক্ত হচ্ছে। বিগত ২০২২ সালে পরীক্ষায় শনাক্ত ৬২টি নমুনার ৬১টিই গাংনী থেকে এবং একটি সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ থেকে ছিরো। আর ২০২৩ সালে পরীক্ষিত নমুনার মধ্যে ৭৮টি পজিটিভ হয় এবং সবগুলোই গাংনী উপজেলার। সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে ২০২২ সালে একটি পরীক্ষায় অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়েছিল। ২০২৫ সালে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে রুগ্ন গরুর মাংসের সংস্পর্শে আসা অন্তত ১৫ জনের অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। মেহেরপুর ও কুষ্টিয়ার পাশাপাশি সাতক্ষীরাতেও অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়েছে। ২০২৫ সালে রংপুরের পীরগাছা, মিঠাপুকুর ও কাউনিয়ায় অ্যানথ্রাক্সের রোগী শনাক্তের খবর আসে। ২০২৫ সালে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে অসুস্থ গরু জবাইয়ের পর মানুষের মধ্যে অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ দেখা দেয়। তাছাড়া ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধায় ধারাবাহিকভাবে অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল।
সূত্র জানায়, দেশের বিভিন্ন জেলায় অ্যানথ্রাক্স ছড়িয়ে পড়ায় প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও স্বাস্থ্য বিভাগের টনক নড়েছে। কারণ ইতিমধ্যে রংপুরের পীরগাছা, মিঠাপুকুর ও গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়েছে। মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় আশঙ্কাজনকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে অ্যানথ্রাক্স। চলতি বছরের গত ৯ মাসে গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রায় ৩২৬ জন অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। আক্রান্ত গবাদিপশু জবাই ও মাংস কাটাকাটির সময় মানুষের শরীরে এ রোগ ছড়িয়ে থাকতে পারে। গাংনী উপজেলায় আগস্ট মাসে ৩৮ জন অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে। আর সেপ্টেম্বরে শনাক্ত হয়েছে ১৮ জন। আক্রান্তরা মূলত রুগ্ন ছাগলের মাংস কাটাকাটি বা নাড়াচাড়ার কারণে সংক্রমিত হয়েছে। তবে তাদের কেউ হাসপাতালে ভর্তি হয়নি। তাছাড়া গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে ৩ জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়েছে। ওই উপজেলায় অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে ৩৪ জনে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া রংপুর জেলার পীরগাছা উপজেলায় এবং দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর উপজেলায় অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আর দুই মাস আগে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় অ্যানথ্রাক্স দেখা দিয়েছিল।
সূত্র আরো জানায়, অ্যানথ্রাক্স তিন ধরনের হয়ে থাকে। তবে এদেশে কিউটেনিয়াস অ্যানথ্রাক্স হচ্ছে। কিন্তু কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা না থাকায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে ওই। তবে অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে প্রাণিসম্পদ বিভাগ কাজ করছে। অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত বা সন্দেহজনক গবাদিপশু জবাই না করে দ্রুত সংশ্লিষ্ট প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের জানানো এবং আক্রান্ত পশুর মাংস স্পর্শ ও নাড়াচাড়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। কুষ্টিয়ায় জেলায় সারা বছরই এ রোগে আক্রান্ত দুই-একজন রোগী হাসপাতাল বা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা গ্রহণ করে থাকেন। তবে অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া, ঘোড়াসহ ঝুঁকিপূর্ণ প্রাণীগুলোকে নিয়মিত টিকাদানের আওতায় আনা জরুরি। নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা যেমন সরকার এবং পশুর মালিকদের দায়িত্ব রয়েছে। পাশাপাশি আক্রান্ত পশুকে হাটবাজার বা অন্য কোথাও নেয়া যাবে না। এমনকি কোনো পশু অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে নির্ধারিত নিয়মে মাটির নিচে পুঁতে ফেলতে হবে। অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু মাটিতে দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে। ফলে কোনো এলাকায় একবার সংক্রমণ দেখা দিলে পরবর্তী সময়েও সেখানে আবার সংক্রমণের ঘটনা ঘটতে পারে। উত্তরাঞ্চলে অ্যানথ্রাক্সের প্রকোপ তুলনামূলক বেশি দেখা যায় এবং এবার রংপুর জোনেও সংক্রমণ শনাক্ত হচ্ছে।
এদিকে এ ব্যাপারে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী আহমেদ জাকী জানান, অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ শনাক্তে শুধু পাঁচ জেলা নয়, দেশের সব জেলাতেই সার্ভিলেন্স কার্যক্রম চালু রয়েছে। কোনো এলাকায় প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে আইইডিসিআরের টিম সেখানে গিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা, সংক্রমণের ধরন ও করণীয় বিষয়ে পরিস্থিতি যাচাই করে। বর্তমানে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জেও আইইডিসিআরের একটি দল কাজ করছে।