কলাপাড়ায়

প্রাকৃতিক ও মানুষ সৃষ্ট বিপর্যয়ে অস্তিত্ব সংকটে গঙ্গামতির সংরক্ষিত বনাঞ্চল

এফএনএস (কুয়াকাটা, পটুয়াখালী) : | প্রকাশ: ১০ অক্টোবর, ২০২৬, ০৬:০৭ পিএম
প্রাকৃতিক ও মানুষ সৃষ্ট বিপর্যয়ে অস্তিত্ব সংকটে গঙ্গামতির সংরক্ষিত বনাঞ্চল

একদিকে সাগরের তীব্র ভাঙনে সংরক্ষিত গঙ্গামতি বনাঞ্চলের এক তৃতীয়াংশ বিলীন হয়ে গেছে। অপরদিক থেকে বনাঞ্চলের আশপাশের ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছপালা রয়েছে তা দখল করে দেয়া হয়েছে আবাসন কোম্পানির সাইনবোর্ড। বনাঞ্চল, পানির প্রবাহ রয়েছে এমন সরকারি খাল-জলাশয় বিলসহ খাসজমি সব দখল করা হচ্ছে। এরপরে বনাঞ্চলের মধ্যে জোয়ার-ভাটার পানির প্রবাহ বন্ধ করে শাখা খালগুলোতে বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহ আটকে মাছ ধরছে প্রভাবশালীমহল। ফলে সহস্রাধিক একর জুড়ে পরিবেশ সংবেদনশীল গঙ্গামতির সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলটি এখন বহুমুখী সংকটে উজাড়ের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বনবিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড এসব দেখভালের দায়িত্বে থাকলেও তাঁদের নীরবতার পাশাপাশি কারও কারও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। উপকূলীয় সাগরপারের এই বৃহৎ বনাঞ্চলটি এখন ধ্বংসের মুখোমুখি রয়েছে। যেন চারদিক থেকে দখলদারিত্ব চলছে। সব চলে ফ্রি-স্টাইলে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এসব দেখার কেউ নেই। পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় বর্তমানে এই গঙ্গমতির বনাঞ্চলটি সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ সংরক্ষিত বনাঞ্চল। যা এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

২০০৪ সালের এক তথ্যে জানা গেছে, গঙ্গামতি ক্যাম্পের আয়তন  ১১২৮ একর। যার অধিকাংশ ম্যানগ্রোভ প্রজাতির বনাঞ্চল। যা ঝড় জলোচ্ছ্বাসে ওই উপকূলকে রক্ষা করে আসছে। কিন্তু প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে (সাগরের ভাঙনে) এই বনাঞ্চলের পরিধি ক্রমশ ছোট হয়ে গেছে। এখন যা আছে তাও ধ্বংসের মুখোমুখি। 

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বনটির দক্ষিণ দিকটা সাগরের অব্যাহত ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। বনবিভাগের অফিসের পাশে উত্তর দিকটার খাল-বিল বনাঞ্চলসহ বিরাট এলাকা জুড়ে প্লাবনভূমিতে শোভা পাচ্ছে দুটি আবাসন (হাউজিং) কোম্পানির শত শত সাইনবোর্ড। একটা সীভাইন ভিলেজ, আরেকটি বালিয়াড়ী। মোট কথা বনাঞ্চলটিকে যেন গিলে খাওয়ার তান্ডব চলছে। আশপাশে চলছে বাঁধ দিয়ে বনের মধ্যে ছোট ছোট খালগুলো দখল। ধরা হচ্ছে মাছ। আর গাছগুলো মরতে শুরু করেছে। 

জেলেরা জানান, বনের মধ্যে কিংবা আশপাশের ছোট ছোট চ্যানেল দিয়ে তাঁরা ট্রলার নিয়ে সাগরে যাওয়া-আসা করতেন, তাও এখন দখল করা হয়েছে। বনের মধ্যে খালগুলোতে বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহ আটকে প্রথমে ছইলা-কেওড়া গাছ মেরে ফেলা হয়। তারপর বিরাণভূমিতে পরিণত হয়। তখন কোথাও চাষের জমি- আবার কোথাও আবাসন কোম্পানির সাইনবোর্ড দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়া এখনও চলমান থাকলেও কেউ এসব রক্ষায় কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেয় না।

গঙ্গামতি যাওয়ার পথে ধোলাই মার্কেটের আশাপাশে সবচেয়ে বাজে অবস্থা। সেখানকার ব্রিজের দক্ষিণ পাশে গঙ্গামতি সৈকতে যেতে সড়কের ডানদিকে অসংখ্য ছইলা-কেওড়া গাছের চারদিকে রিংবেড়িবাঁধ দিয়ে পানরি প্রবাহ আটকে দেয়া হয়েছে। অসংখ্য প্রাচীন ম্যানগ্রোভ গাছ বিবর্ণ হয়ে গেছে। স্থানীয়রা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানালেন, এক সময় গাছগুলো মরে গেলে জায়গাটি দখল করা হবে।

আবসার আলী নামের এক জেলে জানালেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বেড়িবাঁধের মাটি কাটার জন্য স্কেভেটর (বেকু) মেশিন দিয়ে বাইরের মাটি কাটার সময় গাছপালাও উপড়ে ফেলা হয়েছে। এতে দখলদারদের আরও সুবিধা হয়েছে। দেখালেন তিনি, শত শত গাছের গোড়া এখনও রয়ে গেছে। এখন আবার বনাঞ্চলের মধ্যে সোতা খালে বাঁধ দিয়ে মাছ ধরা হচ্ছে। পানির চলাচল আটকে দিলে প্রাচীণ ছইলা-কেওড়া গাছ মরে যায়। স্থানীয় ছাত্র সংগঠনের এক নেতার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছে। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে আরও দুই ব্যক্তি। এদের বিরুদ্ধে ভয়ে কেউ মুখ খুলতে চায় না। এভাবে বন উজাড় করা চলছে। কেউ কেউ আবার সুযোগ বুঝে গাছ কেটে নেয়। এক সময় পরিণত হয় বিরাণভূমি।

বনটির চারপাশের জমিতে আবার চাষাবাদ করা হয়। ফলে প্রাকৃতিকভাবে কোন গাছের চারাও জন্মাতে পারে না। বনটির ওপর যেন নিধনের বহুমুখি তান্ডব চালানো হচ্ছে। এভাবে এখন একমাত্র সবচেয়ে বড় আয়তনের সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলটি উজাড় হয়ে গেলেও বনবিভাগ যেন নাক ডেকে ঘুমুচ্ছে। এসব বন্ধে কিংবা বনাঞ্চলটি রক্ষায় তাঁদের নেই কার্যকর কোন পদক্ষেপ। গঙ্গামতি বনবিভাগের বিট কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, তিনি আজ-কালের মধ্যে এসব দেখে প্রয়োজনীয় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে