রাজধানীর তেজগাঁওয়ের সড়ক ভবন তথা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) এখন সরকারি দপ্তরের বদলে যেন একটি ‘প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি’তে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিনের শেকড় গেড়ে বসা এক অপ্রতিরোধ্য প্রশাসনিক সিন্ডিকেটের ইশারায় চলছে পুরো দপ্তর। বদলি থেকে শুরু করে প্রকল্পের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ-সবকিছুর রিমোট কন্ট্রোল এখন নির্দিষ্ট একটি কক্ষের হাতে। এই তেলেসমাতি সাম্রাজ্যের মূল কাণ্ডারি হিসেবে উঠে এসেছে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এ.কে.এম আজাদ রহমান-এর নাম। তার প্রভাবের কাছে সাধারণ ও সৎ প্রকৌশলীরা পদে পদে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা এবং গোপন নথির ভিত্তিতে সওজের অন্দরের চাঞ্চল্যকর এই চিত্র উঠে এসেছে।
সম্পদের পাহাড় ও দুদকের নীরবতা
উত্তরায় আলিশান বসবাস হলেও এ.কে.এম আজাদ রহমান ও তার পরিবারের রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্য বিস্তৃত বহুদূর। বারিধারার অভিজাত এলাকা থেকে শুরু করে পূর্বাচল নতুন শহরের ৯ নম্বর সেক্টরে প্লট বাগানোর সুস্পষ্ট রেকর্ড তাদের ঝুলিতে রয়েছে। নিজ জেলা টাঙ্গাইলেও গড়েছেন জমি ও ইমারতের বিশাল পসরা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত বিপুল সম্পদের পাহাড় গড়লেও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো নজরদারি তার ওপর পড়েনি।
দুর্নীতির স্বীকারোক্তি ও ডিপ ফ্রিজে থাকা মামলা নথি ঘেঁটে আজাদ রহমানের অতীত কর্মজীবনের বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে, যা কোনো থ্রিলার সিনেমাকেও হার মানায়:
সত্য কমিশনে স্বীকারোক্তি: ২০০৭-০৮ সালে তৎকালীন ‘সত্য ও জবাবদিহিতা কমিশন’-এর কাছে একটি অবকাঠামো প্রকল্পে অতিরিক্ত বিল গ্রহণের কথা তিনি লিখিতভাবে স্বীকার করেছিলেন। রাষ্ট্রীয় কোষাগারে সেই টাকা ফেরত দিয়ে সে যাত্রায় তিনি প্রাথমিক ধাক্কা সামলে নেন।
স্থগিত মামলা ও পদোন্নতি: ২০১২ সালে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালায় তার বিরুদ্ধে একটি বিভাগীয় মামলা হয়। কিন্তু মহামান্য হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের (রিট) সুবাদে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে মামলাটি ‘ডিপ ফ্রিজে’ রয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে মামলার সুরাহা হওয়ার আগেই তিনি একের পর এক পদোন্নতি হাতিয়ে নিজের রাজত্ব পোক্ত করেছেন।
বদলি বাণিজ্য ও ‘নুরু-আজাদ’ সিন্ডিকেট সওজে মেধার চেয়ে এখন ‘নুরু-আজাদ’ অক্ষের অন্ধ আনুগত্যই বেশি কদর পাচ্ছে।
বদলি ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ: প্রকৌশলী নুরু ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলা এই সিন্ডিকেট ছাড়া সওজে কোনো কাজ এগোয় না। পদায়ন ও বদলির মৌসুম এলেই এই চক্রের অলিখিত রেটচার্ট কার্যকর হয়। টেন্ডার থেকে শুরু করে প্রশাসনিক অনুমোদন-সবই তাদের একচ্ছত্র ইশারায় চলে।
বিদেশ ভ্রমণের মহোৎসব: সরকারি টাকায় সওজের কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের নামে চলছে হরিলুট। প্রশাসনের সংস্কারের বুলি আওড়ানো হলেও, দুর্নীতিগ্রস্ত একই ক্যাডারদের বারবার একই চেয়ারে বসিয়ে দপ্তরটিকে কার্যত ‘সংস্কারমুক্ত’ করে রাখা হয়েছে।
এসব অনিয়মের বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে চলছে। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে তদন্ত কমিটি গঠন করে এই সিন্ডিকেটের শেকড় উপড়ে ফেলা হবে।
অন্যদিকে, জনপ্রশাসন বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে চরম শ্লেষের দৃষ্টিতে দেখছেন। যাঁদের অতীতে সত্য কমিশনে দুর্নীতির দায় স্বীকারের রেকর্ড রয়েছে, তাঁদেরকে নীতিনির্ধারণী চেয়ারে বসানোকে তারা ‘প্রশাসনিক তামাশা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। সম্পদের হিসাব যাচাই ও নজরদারির কথা কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে সওজকে এই সিন্ডিকেটের থাবা থেকে মুক্ত করা এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।