হাসাউড়ায় দুর্গাপূজার মণ্ডপে তিন ধর্মের মানুষের সম্প্রীতির মিলনমেলা

এফএনএস (একে কুদরত পাশা; দিরাই, সুনামগঞ্জ) : | প্রকাশ: ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৩৯ এএম
হাসাউড়ায় দুর্গাপূজার মণ্ডপে তিন ধর্মের মানুষের সম্প্রীতির মিলনমেলা

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার হাসাউড়া সার্বজনীন দেব মন্দিরে দুর্গাপূজার নবমী তিথিতে সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে সুনামগঞ্জ সদর পিস ফ্যাসিলিটেটর গ্রুপ (পিএফজি)। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে আয়োজিত সম্প্রীতি সমাবেশে একত্রিত হন হিন্দু, মুসলিম ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা। ধর্মীয় ভিন্নতা ভুলে তিন ধর্মের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পূজামণ্ডপটি পরিণত হয় সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও মানবিক বন্ধনের মিলনমেলায়। হাসাউড়া সার্বজনীন দেব মন্দির পূজা কমিটির উদ্যোগে এবং পিএফজির সহযোগিতায় আয়োজিত এ ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের উপস্থিতি সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল খ্রিস্টান শিশু-কিশোরদের পরিবেশনায় প্রাচীন গারো নৃত্য। ঐতিহ্যবাহী এ নৃত্য দেখতে পূজামণ্ডপে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় জমে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পূজা কমিটির সভাপতি মিলন তালুকদার। সঞ্চালনা করেন পিএফজি সদস্য ও পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক কর্ণবাবু দাস। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন দি হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশের কুদরত পাশা। অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রঙ্গারচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হাই, সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কালাম, পিস অ্যাম্বাসেডর মাহবুবুল হাসান শাহীন ও সালেহিন চৌধুরী শুভ।

বক্তব্য দেন পিএফজি সদস্য আবুল হোসেন, নুরুল হাসান আতাহের, সেলিনা আবেদীন, রিনা আক্তার, গাড়ো সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি প্রহর আড়েং, হাসাউড়া সার্বজনীন দেবমন্দির পূজা কমিটির সাবেক সভাপতি হারাধন নন্দী ও প্রফুল্ল পাল। সন্ধ্যায় আরতির মধ্য দিয়ে শুরু হয় সম্প্রীতি সমাবেশের মূল আয়োজন। এরপর খ্রিস্টান ধর্মীয় প্রতিনিধি প্রহর আড়েংয়ের তত্ত্বাবধানে খ্রিস্টান শিশু-কিশোরেরা প্রাচীন গারো নৃত্য পরিবেশন করে। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ অঞ্চলে এ ধরনের পরিবেশনা এটা দ্বিতীয়। গত পূজায়ও পিএফজি এমন আয়োজন করেছিল। নৃত্যের ছন্দ ও গারো জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা দর্শকদের মুগ্ধ করে। পরিবেশনা দেখতে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি সামাল দিতে আনসার সদস্যদের সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। এ সময় বিজিবির টহল দলও পূজা মণ্ডপে দেখা যায়। অনুষ্ঠান শেষে শুরু হয় সাংস্কৃতিক আয়োজন। এতে তিন ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ উৎসবকে ভিন্ন মাত্রা দেয়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় আয়োজনে মুসলিম ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে উঠে আসে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সহাবস্থানের বার্তা। বক্তারা বলেন, একটি অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক সমাজ গঠনে ধর্মীয় সম্প্রীতির বিকল্প নেই। ভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সহযোগিতার সম্পর্ক জোরদার করতে হবে। উৎসব শুধু একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে সামাজিক বন্ধন আরও সুদৃঢ় হবে। সভায় জানানো হয়, পিস ফ্যাসিলিটেটর গ্রুপ (পিএফজি) একটি উদার, অসাম্প্রদায়িক, বহুত্ববাদী, সহনশীল ও মানবিক সমাজ গঠনে কাজ করছে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ, সহিংসতা নিরসন, জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করা, ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা এবং সম্মিলিত উদ্যোগে সামাজিক সমস্যা সমাধানে সংগঠনটি ভূমিকা রাখছে। হাসাউড়ার এ আয়োজন যেন সেই উদ্যোগেরই বাস্তব প্রতিফলন। এখানে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতা কাউকে আলাদা করেনি; বরং উৎসবকে ঘিরে মানুষে মানুষে তৈরি হয়েছে সম্প্রীতির সেতুবন্ধ। তিন ধর্মের মানুষের মিলনমেলা প্রমাণ করেছে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সহযোগিতার মধ্য দিয়েই সমাজে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব। সুনামগঞ্জ সদর পিএফজির এ উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে ধর্মীয় সম্প্রীতি জোরদার এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের ক্ষেত্রে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে