দেশে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে ধান উৎপাদনে কৃষকের খরচ

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৪৮ পিএম
দেশে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে ধান উৎপাদনে কৃষকের খরচ

দেশে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে ধান উৎপাদনে কৃষকের খরচ। কিন্তু সে হারে কৃষক পর্যায়ে ধানের দাম বাড়েনি। মূলত বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ, শ্রম ও জমি প্রস্তুত করাসহ প্রায় সব উপকরণের দাম বাড়ায় ধানের উৎপাদন খরচও বাড়ছে। কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়ছে না ধানের উৎপাদনশীলতা কিংবা কৃষকের লাভ। গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে বর্তমানে প্রতি কেজি ধান উৎপাদনে কৃষকের খরচ গড়ে প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু দেশে বোরোর ফলন বেড়েছে মাত্র ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ আর আমন ধানের ফলন ১৫ দশমিক ৩১ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে বোরো ধানের কৃষক পর্যায়ে প্রাপ্ত দাম গড়ে ১৩ শতাংশের কিছু বেশি আর আমনের ক্ষেত্রে ২৩ শতাংশের মতো দাম বেড়েছে। বিগত ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত বোরোর গড় ফলন বেড়েছে ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ আর আমনে ফলন  ১৫ দশমিক ৩১ শতাংশ বেড়েছে। কৃষি অর্থনীতিবিদ এবং কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, জলবায়ুজনিত অনিশ্চয়তা, কৃষি ইনপুট ও কৃষি শ্রমিকের পেছনে ব্যয় বাড়ায় কৃষকের ধান উৎপাদনে মুনাফা ঋণাত্মক হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ধান ব্যয় কমানো, আধুনিক যন্ত্রাংশের ব্যবহার বাড়ানো এবং উচ্চফলনশীল বীজের সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। তা নাহলে কৃষকরা লোকসান গুনে একসময় ধান উৎপাদন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। তাতে দেশে খাদ্য উৎপাদনে বড় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। বিগত ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রতি কেজি বোরো ধান উৎপাদনে কৃষকের ব্যয় হয় ২৬ টাকা। আর ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৯ টাকা ৫৩ পয়সায় এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩১ টাকা ৬০ পয়সায় দাঁড়ায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যয় কিছুটা কমে ৩০ দশমিক শূন্য ৫ টাকা হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আবারো বেড়ে ৩৪ টাকা ১১ পয়সা হয়েছে। অর্থাৎ পাঁচ বছরে বোরো ধানের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে ৩১ দশমিক ২ শতাংশ। আর আমনের ক্ষেত্রে ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রতি কেজিতে উৎপাদন ব্যয় ছিল ২৫ টাকা ৮০ পয়সা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২৭ দশমিক ৮০ টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২৮ দশমিক ৮৭ টাকা, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৯ দশমিক ৩৯ টাকা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩০ টাকা ৪৬ পয়সায় উন্নীত হয়েছে। ওইসময়ে আমনের উৎপাদন ব্যয় ১৮ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ বেড়েছে।

সূত্র জানায়, ধান চাষে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও ধানের উৎপাদনশীলতা বাড়েনি। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো জরুরি। বর্তমানে কৃষকরা ধানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। বরং লাভের বড় অংশই নানা মধ্যস্বত্বভোগী হাতিয়ে নিচ্ছে। সেজন্য বাজার ব্যবস্থাপনাও জরুরি। কারণ ন্যায্যমূল্য পেলে ও উৎপাদনশীলতা বাড়লে কৃষক লাভবান হবে। আর কৃষক লাভবান হলে দেশের খাদ্যনিরাপত্তাও নিশ্চিত থাকবে। ধান উৎপাদনে সেচ ব্যয় বাড়ার অন্যতম বড় কারণ। বিশেষ করে বোরো ধান শুষ্ক মৌসুমে উৎপাদিত হওয়ায় সেচের ওপর নির্ভরতা বেশি। দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের অনেক এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করেই আবাদ করতে হয় বোরো। কিন্তু ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, জ্বালানির মূল্য এবং সেচের ব্যয় বোরো উৎপাদনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। তাছাড়া ধান চাষে  জমিতে বাড়ছে রাসায়নিক সারের ব্যবহারও। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় বেশি বা ভারসাম্যহীন সার ব্যবহারে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মাটির স্বাস্থ্যও। বাংলাদেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ কৃষকই নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম ও সালফার অসম মাত্রায় ব্যবহার করে। যা মাটির স্বাস্থ্য, ফসলের উৎপাদনশীলতা ও কৃষির দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের জন্য উদ্বেগজনক। কারণ সারের ভারসাম্যহীনতা মাটিতে পুষ্টির অসামঞ্জস্য তৈরি করে। তাছাড়াও প্লাস্টিক ও দূষণেও মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট হচ্ছে। ফলে কৃষি উৎপাদনশীলতা কমছে এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। শুধু কৃষি উপকরণের দাম নয়, আবহাওয়ার পরিবর্তনও ধানের উৎপাদনশীলতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। অতিরিক্ত তাপ, অনিয়মিত বৃষ্টি, খরা, বন্যা ও আকস্মিক জলাবদ্ধতা এখন কৃষকের উৎপাদন পরিকল্পনাকে অনিশ্চিত করে তুলছে। তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে কৃষিজমি কমে যাওয়ার প্রবণতা। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশে আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। প্রতি বছর দেশে ২০ থেকে ২২ লাখ মানুষ বাড়লেও বিপরীতে প্রতি বছর দশমিক ৩৬ শতাংশ হারে কৃষিজমি কমছে। প্রতিদিন প্রায় ৩০৭ একর জমি শিল্পায়ন, নগরায়ণ, বসতবাড়ি ও সড়ক নির্মাণের কাজে চলে যাচ্ছে।

সূত্র আরো জানায়, চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত প্রতি কেজি আমনের গড় দাম ৩০ দশমিক ৬৬ টাকা ছিলো। আর বোরোর ক্ষেত্রে তা ছিলো ৩১ টাকা ২৪ পয়সা।  অথচ বোরোর কেজিপ্রতি উৎপাদন ব্যয় ৩৪ টাকার ওপরে। তারপরও বোরো ধান সংগ্রহ মৌসুমে প্রতিবারই ধানের দাম কম থাকে। গত ২০২৫ সালে বোরো ধানের কৃষক পর্যায়ে প্রাপ্ত কেজিপ্রতি গড় দাম ছিল ৩৪ দশমিক ৫৭ টাকা, আর আমনে ৩৫ দশমিক ৩০ টাকা। ২০২৪ সালে বোরোর গড় দাম ছিল ৩২ দশমিক ২৮ টাকা এবং আমনের ৩৩ দশমিক ১৮ টাকা। ২০২৩ সালে আমনের গড় দাম ছিল ৩০ টাকা ৭১ পয়সা এবং বোরোর ৩০ টাকা ৫১ পয়সা। ২০২২ সালে কৃষক পর্যায়ে আমনের গড় দাম ছিল ২৮ টাকা ৩৪ পয়সা। বোরোর ছিল ৩০ টাকা ৫০ পয়সা। তাছাড়া এখন কৃষির সংকট শুধু উৎপাদন খরচের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বরং জমি কমছে ও ভূগর্ভস্থ পানি কমছে, মাটির ওপর চাপ ও আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা বাড়ছে। বাজারে কৃষকের দরকষাকষির ক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়ছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে কৃষির সেচ ও পরিবহনে ব্যয় বাড়ছে। যা কৃষকের উৎপাদন খরচেও প্রভাব ফেলছে। 

এদিকে কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশে সবচেয়ে বেশি চাষ হয় ধান। আর কৃষক ধানে মুনাফা না পেলে উৎপাদন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। যদিও কোনো কোনো জমিতে ধানের বিকল্প চাষের সুযোগ না থাকায়  বাধ্য হয়ে হয়তো সেখানেই ধানই চাষ হবে। কিন্তু অন্যরা ধীরে ধীরে অন্যদিকে ধাবিত হবে। যদিও অন্য ফসলে উৎপাদনেও কৃষকরা শ্রম ও বিনিয়োগের বিপরীতে কতটা মুনাফা হবে সেই প্রশ্ন থেকে যায়। তাছাড়া বর্তমান আবহাওয়াজনিত কারণে এদেশের কৃষির প্রবৃদ্ধি টেকসই নয়। কোনো বছর প্রবৃদ্ধি ২ থেকে ৩ শতাংশ বেড়ে গেলেও আবার কখনো ২ থেকে ৩ শতাংশ কমে যায়। সেজন্য জলবায়ু সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন জরুরি। 

এদিকে সার্বিক বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানান, ধান চাষে কৃষকের মূল ব্যয় সার, শ্রমিক ও সেচে। জরিপ করে দেখা গেছে কৃষক যে পরিমাণ রাসায়নিক সার ব্যবহার করে তা ২৩ থেকে ২৭ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব। সেজন্য মাটির সমস্যাগুলো দূর করতে হবে। তাছাড়া  শ্রমিকের ব্যয় কমাতে মেকানাইজেশনে যাওয়া হবে। তাতে ব্যয় কমে আসবে। আর সেচের ব্যয় কমাতে ডিপ টিউবওয়েলকে সোলারে কনভার্টের কাজ চলছে। কয়েক হাজার সোলারে কনভার্ট হয়েছে। আগামী বছরের মধ্যে ৬০-৭০ হাজার ডিপ টিউবওয়েলকে সোলারে কনভার্ট করার পরিকল্পনা রয়েছে। তাতে কৃষকের সেচের জন্য বিদ্যুৎ ও ডিজেল খরচ বেঁচে যাবে। কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমাতে ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সরকার কাজ করছে।