শ্রীমঙ্গলের মাঠে মাঠে হলুদের সমারোহ, ভাল ফলনের আশায় কৃষক

এফএনএস (আতাউর রহমান কাজল; শ্রীমঙ্গল, মৌলভী বাজার) : | প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ০২:২২ পিএম
শ্রীমঙ্গলের মাঠে মাঠে হলুদের সমারোহ, ভাল ফলনের আশায় কৃষক

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে চলতি মৌসুমে হলুদের ভালো ফলনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৬৯ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ এই মসলাজাতীয় ফসলের। উন্নত জাতের ব্যবহার, কৃষি বিভাগের প্রদর্শনী এবং আধুনিক চাষাবাদ প্রযুক্তি সম্পর্কে কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে হলুদ চাষে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া ও সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে এবার আশানুরূপ ফলন পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুমা পাল জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১০টি প্রদর্শণী প্লট স্থাপন করা হয়েছে।

শ্রীমঙ্গল উপজেলায় প্রধানত বারি হলুদ-১ ও ডিমলা জাতের হলুদ চাষ করা হয়েছে। মসলাজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি, উন্নত জাতের সম্প্রসারণ এবং কৃষকদের আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তিতে উদ্বুদ্ধ করতে উপজেলা কৃষি বিভাগ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। এর অংশ হিসেবে মসলার উন্নত জাত সম্প্রসারণ প্রকল্প ও ফ্রীপ (ঋজঊঅচ) প্রকল্পের আওতায় হলুদ চাষের একাধিক প্রদর্শনী স্থাপন করা হয়েছে। এসব প্রদর্শনীর মাধ্যমে কৃষকদের উন্নত জাতের হলুদ চাষ, সুষম সার প্রয়োগ, আগাছা দমন, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন বৃদ্ধির আধুনিক কৌশল সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হচ্ছে।

রান্নাঘরের অপরিহার্য মসলা হলুদ

হলুদ (বৈজ্ঞানিক নাম: ঈঁৎপঁসধ ষড়হমধ) আদা পরিবারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদ। এর ভূগর্ভস্থ রাইজোম বা গ্রন্থিকাণ্ড মসলা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি পরিবারের রান্নায় হলুদ অপরিহার্য। খাবারের রং ও স্বাদ বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন প্রসাধনী ও রং তৈরির কাজেও হলুদের ব্যবহার রয়েছে।

দেশের মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় এই মসলার চাহিদা পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর গুরুত্ব রয়েছে। এ ক্ষেত্রে উন্নত জাতের ব্যবহার, মানসম্মত বীজকন্দ বা রোপণ উপকরণ নির্বাচন এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শ্রীমঙ্গলের উপযোগী জমিতে পরিকল্পিতভাবে হলুদ চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকদের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে মসলাজাতীয় ফসলের উৎপাদনও বাড়তে পারে।

৬৯ হেক্টর জমিতে সম্ভাব্য উৎপাদন ১ হাজার ৩৮০ মেট্রিক টন

কৃষি উৎপাদনের সাধারণ হিসাব অনুযায়ী, প্রতি হেক্টরে গড়ে ২০ মেট্রিক টন কাঁচা হলুদ উৎপাদিত হলে শ্রীমঙ্গলের ৬৯ হেক্টর জমি থেকে প্রায় ১ হাজার ৩৮০ মেট্রিক টন হলুদ পাওয়া সম্ভব। তবে এটি সম্ভাব্য উৎপাদনের একটি আনুমানিক হিসাব। চলতি মৌসুমে প্রকৃত উৎপাদনের পরিমাণ নির্ভর করবে জাত, মাটির উর্বরতা, আবহাওয়া, পরিচর্যা ও রোগবালাই পরিস্থিতির ওপর। ফসল সংগ্রহের পরই প্রকৃত ফলন সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় বারি হলুদ-১ জাত থেকে হেক্টরপ্রতি প্রায় ২০-২৫ মেট্রিক টন এবং ডিমলা জাত থেকে প্রায় ১৫-২০ মেট্রিক টন কাঁচা হলুদ উৎপাদনের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হয়। তবে জাতভিত্তিক ফলন অঞ্চল ও চাষাবাদ পদ্ধতিভেদে ভিন্ন হতে পারে। শ্রীমঙ্গলের চলতি মৌসুমের মাঠপর্যায়ের ফলন যাচাই ছাড়া এসব পরিসরকে স্থানীয় ফলনের নিশ্চিত চিত্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

সঠিক পরিচর্যায় বাড়বে ফলন

হলুদ চাষে জমি নির্বাচন ও পানি নিষ্কাশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত উর্বর, ঝুরঝুরে এবং পানি সহজে বের হয়ে যায়-এমন জমি হলুদ চাষের জন্য উপযোগী। হলুদ বৃষ্টিনির্ভর ফসল হলেও দীর্ঘ সময় জমিতে পানি জমে থাকলে রাইজোম পচাসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই জমিতে নালা তৈরি এবং অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন।

মানসম্মত ও রোগমুক্ত রোপণ উপকরণ ব্যবহার, মাটির অবস্থা অনুযায়ী সুষম সার প্রয়োগ, সময়মতো আগাছা দমন এবং রোগবালাই পর্যবেক্ষণও ফলন বৃদ্ধিতে সহায়ক। ফসল পরিপক্ব হলে সঠিক সময়ে সংগ্রহ করতে হবে। এরপর পরিষ্কার করা, প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিকভাবে শুকানো এবং উপযুক্ত পরিবেশে সংরক্ষণের মাধ্যমে হলুদের গুণগত মান বজায় রাখা সম্ভব।

কৃষকদের পাশে কৃষি বিভাগ

শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি বিভাগের কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার উজ্জ্বল সূত্রধর বলেন, “শ্রীমঙ্গলে হলুদ চাষ সম্প্রসারণের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ৬৯ হেক্টর জমিতে হলুদ আবাদ হয়েছে। বারি হলুদ-১ ও ডিমলা জাতের হলুদ চাষের পাশাপাশি মসলার উন্নত জাত সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং ফ্রীপ (ঋজঊঅচ) প্রকল্পের মাধ্যমে একাধিক প্রদর্শনী বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এসব প্রদর্শনীর মূল উদ্দেশ্য হলো কৃষকদের উন্নত জাত ও আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করা এবং মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো।

“মানসম্মত রোপণ উপকরণ ব্যবহার, সুষম সার প্রয়োগ, আগাছা ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনা এবং জমিতে পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে হলুদের ফলন ও গুণগত মান বৃদ্ধি করা সম্ভব। কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় কমানো, বাজারজাতকরণে সহায়তা এবং মসলাজাতীয় ফসলের উৎপাদন সম্প্রসারণে উপজেলা কৃষি বিভাগ প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করে যাচ্ছে।”

লাভজনক চাষে প্রয়োজন বাজারব্যবস্থা

হলুদ চাষের সম্প্রসারণে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদন ব্যয়, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন খরচ এবং বাজারদর বিবেচনায় নিয়ে কৃষকদের লাভের হিসাব করতে হয়। ফসল সংগ্রহের মৌসুমে ন্যায্যমূল্য, সংরক্ষণের সুযোগ ও সহজ বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করা গেলে হলুদ চাষে কৃষকদের আগ্রহ আরও বাড়তে পারে।

কৃষি বিভাগের প্রত্যাশা, উন্নত জাতের সম্প্রসারণ, প্রদর্শনীর মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং কৃষকদের নিয়মিত কারিগরি সহায়তার ফলে শ্রীমঙ্গলে হলুদের উৎপাদনশীলতা বাড়বে। এতে একদিকে কৃষকদের আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে দেশের মসলাজাতীয় ফসলের উৎপাদন সম্প্রসারণেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে