অপারেটর নয়, আগে ভাবতে হবে গ্রাহকের স্বার্থ

সম্পাদকীয় | প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৪:৫৭ পিএম
অপারেটর নয়, আগে ভাবতে হবে গ্রাহকের স্বার্থ

মোবাইল ফোন এখন আর কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা, বিনোদন থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার অপরিহার্য। অথচ এই সেবার মূল্য নির্ধারণ ও প্যাকেজ ব্যবস্থাপনায় সাধারণ গ্রাহকের স্বার্থ কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মোবাইল অপারেটরদের তরঙ্গ নবায়ন ফি কমানোর প্রস্তাব নিয়ে যখন আলোচনা চলছে, তখন সরকারের প্রধান বিবেচনা হওয়া উচিত জনগণের স্বার্থ, শুধু অপারেটরদের ব্যবসায়িক সুবিধা কিংবা রাজস্বের হিসাব নয়।

বিটিআরসি তরঙ্গ নবায়নের মূল্য ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এতে সরকারের সম্ভাব্য আয় ১৬ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা থেকে কমে ১৩ হাজার ১০০ কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে। অপারেটররা এই প্রস্তাবের পরও আরও কম দাম, দীর্ঘ মেয়াদে কিস্তিতে অর্থ পরিশোধ এবং বার্ষিক চার্জ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। তাদের যুক্তি, ব্যয় কমলে নেটওয়ার্ক উন্নয়ন ও সেবার মান বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, অপারেটরদের খরচ কমলেই গ্রাহকের খরচ কমে না। সেই সুবিধা গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা কোথায়?

মোবাইল ইন্টারনেট ও কলের প্যাকেজ ব্যবস্থাপনাতেও গ্রাহকের স্বার্থ উপেক্ষিত হওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অপারেটররা নির্দিষ্ট মেয়াদে নানা প্যাকেজ ঘোষণা করে। গ্রাহক নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী টাকা দিয়ে ডাটা বা মিনিট কেনেন। কিন্তু মেয়াদ শেষ হলে অব্যবহৃত সুবিধার বড় অংশই হারিয়ে যায়। ডাটা প্যাকেজের ক্ষেত্রে একই প্যাকেজ মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে পুনরায় কিনলে অব্যবহৃত ডাটা পরবর্তী প্যাকেজে যুক্ত করার নিয়ম থাকলেও সাধারণ গ্রাহকের জন্য এটি সব সময় সহজ নয়। প্যাকেজের শর্ত, মেয়াদ ও নবায়নের নিয়ম বুঝতে না পারলে গ্রাহককেই আর্থিক ক্ষতি মেনে নিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় নবায়ন বা ব্যালান্স থেকে টাকা কাটার বিষয়েও গ্রাহকের স্পষ্ট সম্মতি ও আগাম সতর্কতা নিশ্চিত করা জরুরি।

বিটিআরসির দায়িত্ব শুধু প্যাকেজের সংখ্যা বা মূল্য নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। গ্রাহক যে সুবিধার জন্য টাকা দিয়েছেন, তার ন্যায্য ব্যবহার নিশ্চিত করাও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে যথাসময়ে বার্তা পাঠানো, অব্যবহৃত ডাটা সংরক্ষণের নিয়ম সহজ করা এবং স্বয়ংক্রিয় টাকা কাটার ক্ষেত্রে গ্রাহকের সম্মতি বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। অযৌক্তিকভাবে অব্যবহৃত ব্যালান্স বা সুবিধা বাতিলের সুযোগও পর্যালোচনা করতে হবে।

তরঙ্গের দাম কমানো হলে তার বিনিময়ে অপারেটরদের সেবার মান উন্নয়নের সুনির্দিষ্ট শর্ত দিতে হবে। নেটওয়ার্কের গতি, কলের মান, গ্রাম ও শহরে সংযোগের প্রাপ্যতা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। শর্ত ভঙ্গ করলে জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারের রাজস্ব প্রয়োজন আছে, অপারেটরদের ব্যবসা টেকসই রাখাও জরুরি। কিন্তু এই দুইয়ের মাঝখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ ১৯ কোটির বেশি মোবাইল গ্রাহক। তাঁদের টাকা ও অধিকার সুরক্ষিত না হলে কোনো ছাড় বা নীতিগত পরিবর্তনের সুফল অর্থবহ হবে না। সরকারের সিদ্ধান্তে তাই প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত, এতে সাধারণ মানুষের কী লাভ হবে? অপারেটরদের সুবিধা নয়, জনগণের স্বার্থই হোক টেলিযোগাযোগ নীতির প্রধান বিবেচনা।