ওসমানী হাসপাতালে সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য জড়িত হামলাকারীদের গ্রেপ্তার দাবি

এফএনএস (এইচ এম শহীদুল ইসলাম; সিলেট) : | প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৬:২৩ পিএম
ওসমানী হাসপাতালে সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য জড়িত হামলাকারীদের  গ্রেপ্তার দাবি

সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে দুই সাংবাদিকের ওপর ইন্টার্ন চিকিৎসকদের হামলার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন সিলেটের সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ। তাঁরা বলেছেন, সাংবাদিকদের ওপর এই ন্যক্কারজনক হামলা কেবল ব্যক্তিগত আক্রোশের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি স্বাধীন সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং সাধারণ মানুষের ন্যায্য চিকিৎসাসেবা পাওয়ার অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত। সত্য প্রকাশের কারণে সাংবাদিকদের রক্তাক্ত হতে হলে তা কোনোভাবেই সভ্য সমাজে মেনে নেওয়া যায় না। বক্তারা আরও বলেন, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি সিলেটের সর্বস্তরের মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান আশ্রয়স্থল। এখানে চিকিৎসাসেবার নামে বিশৃঙ্খলা, সন্ত্রাস, পেশিশক্তির প্রদর্শন কিংবা সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার কোনো সুযোগ নেই। হাসপাতালকে জিম্মি করে দাবি আদায় এবং ভিন্নমত দমনে হামলার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় এর দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও নিতে হবে।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) দুপুরে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে ওসমানী হাসপাতালে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলার শিকার সাংবাদিক রেজা রুবেল ও নিবেন্দু তালুকদারের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে সর্বস্তরের সাংবাদিকদের উদ্যোগে আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা এসব কথা বলেন। সমাবেশে সিলেটের বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, রাজনীতিবিদ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ সংহতি প্রকাশ করে অংশগ্রহণ করেন। সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি মুকতাবিস-উন-নূরের সভাপতিত্বে এবং জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনের পরিচালনায় সমাবেশে বক্তারা বলেন, এই সমাবেশ শুধু দুই সাংবাদিকের ওপর হামলার প্রতিবাদ নয়; এটি অন্যায়, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সিলেটবাসীর সম্মিলিত প্রতিবাদ। সাংবাদিকরা অতীতে ওসমানী হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকদের আন্দোলন-সংগ্রামের খবর গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করেছেন এবং তাঁদের দাবিদাওয়ার পক্ষে জনমত তৈরিতে ভূমিকা রেখেছেন। অথচ আজ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সেই সাংবাদিকদেরই রক্তাক্ত হতে হয়েছে। এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ও নিন্দনীয়।

বক্তারা বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত করে রোগী ও তাঁদের স্বজনদের জিম্মি করার সংস্কৃতি কোনোভাবেই চলতে পারে না। চিকিৎসক ও সাংবাদিক-উভয় পেশাই মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত। এক পেশার মানুষের হাতে অন্য পেশার মানুষ আক্রান্ত হওয়া শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিই ক্ষুণ্ন করে না, গোটা সমাজের জন্য উদ্বেগজনক বার্তা দেয়।

তিন দিনেও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেই, কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন:সমাবেশে ক্ষোভ প্রকাশ করে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ বলেন, ঘটনার তিন দিন অতিবাহিত হলেও হাসপাতাল প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান ও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। দুই সাংবাদিককে প্রকাশ্যে মারধর করে রক্তাক্ত করার পরও যদি হামলাকারীরা জবাবদিহির বাইরে থাকে, তাহলে সাধারণ রোগী, তাঁদের স্বজন ও সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা কোথায়?

তাঁরা বলেন, অতীতে হাসপাতালের অচলাবস্থা নিরসনে প্রশাসন দ্রুত উদ্যোগ নিলেও সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকা অত্যন্ত হতাশাজনক। অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং হামলায় জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। কোনো প্রভাব, পেশাগত পরিচয় কিংবা সাংগঠনিক শক্তি যেন অপরাধীদের রক্ষাকবচ হতে না পারে।বক্তারা আরও বলেন, ইন্টার্ন চিকিৎসকদের একটি অংশের বিরুদ্ধে রোগীর স্বজন ও সাধারণ মানুষকে হেনস্তা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং লাঠিসোটা দিয়ে মারধরের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। হাসপাতালের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে কোনো ধরনের পেশিশক্তি, দখলদারত্ব কিংবা স্বেচ্ছাচারিতার স্থান থাকতে পারে না। চিকিৎসাসেবা নিতে আসা মানুষকে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রেখে কোনো হাসপাতাল তার মানবিক দায়িত্ব পালন করতে পারে না।

আপস নয়, বিচার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে : সমাবেশ থেকে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ স্পষ্ট করে বলেন, এই ঘটনার কোনো আপসকামী কিংবা দায়সারা সমাধান গ্রহণযোগ্য হবে না। সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের নির্বিঘ্ন চিকিৎসাসেবা পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অবিলম্বে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। তাঁরা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলার বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্রতিবাদ থামবে না। শিগগিরই সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দ ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখান থেকে পরবর্তী কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ কিংবা ভয়ভীতি দেখিয়ে সত্য প্রকাশের পথ বন্ধ করা যাবে না। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী, সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি মঈন উদ্দিন, সিলেট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম, সাবেক সভাপতি ইকরামুল কবির ইকু, সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সিনিয়র সদস্য অধ্যক্ষ লিয়াকত শাহ ফরিদী, ইলেকট্রনিক মিডিয়া জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (ইমজা) সিলেটের সভাপতি মো. মাহবুবুর রহমান রিপন, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি সিলেট ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল হক চৌধুরী (ভিপি মাহবুব), সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহ দিদার আলম চৌধুরী নবেল, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাবের সভাপতি গুলজার আহমদ হেলাল, বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন সিলেট বিভাগীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হুমায়ূন কবীর লিটন এবং মাল্টিমিডিয়া জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন সিলেটে আহবায়ক মাসুদ আহমদ রনি প্রমুখ।

সমাবেশে সংহতি জানিয়ে উপস্থিত ছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাব এবং দক্ষিণ সুরমা, বিশ্বনাথসহ বিভিন্ন উপজেলা প্রেসক্লাবের নেতৃবৃন্দ। এ ছাড়া সিলেট উইমেনস জার্নালিস্ট ক্লাব ও বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সিলেট বিভাগীয় কমিটির নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে প্রতিবাদ জানান।

যেভাবে হামলার শিকার হন দুই সাংবাদিক

উল্লেখ্য, গত বুধবার (২৮ অক্টোবর) রাত ১০টার দিকে এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের মারধরের খবর পেয়ে তথ্য ও ছবি সংগ্রহ করতে যান দৈনিক শ্যামল সিলেটের ফটোসাংবাদিক রেজা রুবেল এবং নিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল সিলেটভিউ২৪-এর নিজস্ব প্রতিবেদক নিবেন্দু তালুকদার। এ সময় ইন্টার্ন চিকিৎসকদের একটি অংশ তাঁদের ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, হামলাকারীরা স্যালাইনের স্ট্যান্ড দিয়ে দুই সাংবাদিকের মাথায় আঘাত করে এবং বেধড়ক মারধর করে। এতে তাঁরা রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত হন। নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় ও পরিচয়পত্র বারবার প্রদর্শন করার পরও হামলাকারীদের হাত থেকে রেহাই পাননি তাঁরা। আহত দুই সাংবাদিকই সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সদস্য।

সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের বক্তব্য, এই ঘটনা শুধু দুই সংবাদকর্মীর ওপর শারীরিক আক্রমণ নয়; এটি হাসপাতালের অনিয়ম ও জনদুর্ভোগের তথ্য প্রকাশের পথ রুদ্ধ করার একটি গুরুতর ঘটনা। তাই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক আইনগত শাস্তি এবং হাসপাতালের ভেতরে সাংবাদিক, রোগী ও তাঁদের স্বজনদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

সত্য প্রকাশের অপরাধে সাংবাদিকদের রক্ত ঝরবে, এমন বাংলাদেশ কেউ চায় না। ওসমানী হাসপাতালকে সন্ত্রাস ও জবাবদিহিহীনতার অভয়ারণ্য হতে দেওয়া যাবে না।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে