প্রকৃতির এক ভয়ংকর দুর্যোগ বজ্রপাত। প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে খোলা মাঠে কাজ করা কৃষক, জেলে ও গ্রামীণ জনপদের মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। বজ্রপাতের সময় নিরাপদ আশ্রয় না পাওয়া এবং অসচেতনতার কারণে প্রতি বছরই অকালে ঝরে যাচ্ছে অনেক প্রাণ। এ পরিস্থিতিতে বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে তালগাছ রোপণের উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন। গ্রামাঞ্চলের রাস্তার পাশে, খোলা মাঠের আশপাশে, হাওর ও বিল এলাকায় পরিকল্পিতভাবে তালগাছ লাগানো গেলে দীর্ঘ মেয়াদে তা প্রাকৃতিক সুরক্ষা তৈরিতে সহায়ক হতে উঠবে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা দেশের মানুষকে আবারও বজ্রপাতের ভয়াবহতা মনে করিয়ে দিয়েছে। গত ৩০ অক্টোবর পাবনার সদর উপজেলার সোনাপাতিল বিলে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে শিশু-কিশোরও রয়েছে। এ ঘটনায় আরও দুজন আহত হন। এর আগে সেপ্টেম্বর মাসেও দেশের বিভিন্ন স্থানে বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ১২ সেপ্টেম্বর হাওরে মাছ ধরতে গিয়ে চাচা-ভাতিজার মৃত্যু হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়ায় বজ্রপাতে দুজন এবং ১৮ সেপ্টেম্বর ঝিনাইদহে ঘাস কাটতে গিয়ে একজনের মৃত্যু হয়। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, বজ্রপাতের ঝুঁকি কোনো নির্দিষ্ট মৌসুম বা এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় দেশে বজ্রপাতের প্রাণহানি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। চলতি বছরের ১১ অক্টোবর পর্যন্ত বজ্রপাতে ৩২৯ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। গত ১১ বছরে এ দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ২ হাজার ৮০০ মানুষ। এসব মৃত্যুর বড় অংশই ঘটেছে খোলা মাঠ ও হাওরে কৃষিকাজের সময়। এত প্রাণহানির পরও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্থায়ী সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। তালগাছ রোপণের ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের বদলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। দেশের বজ্রপাতপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে মাঠের পাশে, গ্রামীণ সড়কের দুই ধারে এবং হাওর-বিলের আশপাশে পর্যায়ক্রমে তালগাছ লাগাতে হবে। শুধু চারা রোপণ করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না; গাছগুলো যেন বেড়ে উঠতে পারে, সে জন্য নিয়মিত পরিচর্যা ও সংরক্ষণের ব্যবস্থাও করতে হবে। তালগাছ রোপণের পাশাপাশি বজ্রপাতপ্রবণ মাঠ ও হাওর এলাকায় পর্যাপ্ত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে। আবহাওয়ার আগাম সতর্কবার্তা দ্রুত কৃষক ও জেলেদের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। বজ্রপাত শুরু হলে খোলা জায়গা ছেড়ে পাকা ভবন কিংবা নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে। বজ্রপাত পুরোপুরি ঠেকানো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ, নিরাপদ আশ্রয় এবং সচেতনতার মাধ্যমে প্রাণহানি কমানো সম্ভব। তালগাছ রোপণকে তাই কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না রেখে জাতীয় পর্যায়ের দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগে পরিণত করতে হবে। প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গড়ে তুলতে হবে এমন সুরক্ষাব্যবস্থা, যাতে মাঠে কাজ করতে গিয়ে কিংবা জীবিকার প্রয়োজনে বাইরে বেরিয়ে মানুষকে জীবন হারাতে না হয়।