চিকিৎসাবিজ্ঞান মানবতার সেবার প্রতীক। একজন চিকিৎসকের শিক্ষা শুরু হওয়ার কথা মানুষের জীবন রক্ষার আদর্শ ও নৈতিকতা দিয়ে। অথচ বাংলাদেশে বহু নবীন চিকিৎসকের অ্যানাটমি শিক্ষার সূচনা হচ্ছে কবর থেকে চুরি হওয়া মানুষের হাড় দিয়ে-যা শুধু আইনের লঙ্ঘন নয়, মানবিক মূল্যবোধেরও চরম অবমাননা। পত্রপত্রিকায় উঠেছে এসেছে যে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে একটি সুসংগঠিত ‘কঙ্কাল বাণিজ্য’ চক্র। কবর থেকে লাশ চুরি, রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় হাড় আলাদা করা এবং পরে তা উচ্চমূল্যে বিক্রি-এই পুরো প্রক্রিয়াটি ভয়াবহ ও অমানবিক। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, রাজনৈতিক প্রভাব, অসাধু চক্র ও কিছু প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সহযোগিতায় এ ব্যবসা বছরের পর বছর টিকে আছে। মেডিকেল শিক্ষার্থীদের অনেকেই বলছেন, তারা ব্যক্তিগতভাবে এই প্রথাকে সমর্থন করেন না। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামো এবং পরীক্ষার ধরন তাদের বাধ্য করছে আসল হাড় সংগ্রহ করতে। অর্থাৎ সমস্যাটি কেবল অপরাধচক্রের নয়; এটি নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতারও প্রতিফলন। বিশ্বের চিকিৎসাশিক্ষা এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, থ্রিডি সিমুলেশন, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি এবং উচ্চমানের প্লাস্টিক মডেল ব্যবহার করে উন্নত দেশগুলোতে অ্যানাটমি শিক্ষা আরও আধুনিক, কার্যকর ও মানবিক হয়ে উঠেছে। একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মানুষের শরীরের সূক্ষ্ম গঠন বহু গুণ স্পষ্টভাবে দেখা সম্ভব। পাশের দেশ ভারতেও এখন প্লাস্টিক মডেল ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়ছে। সেখানে বাংলাদেশ এখনো ‘আসল হাড়’ নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে আটকে আছে। এ বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে-প্রযুক্তি যখন বিকল্প সমাধান দিচ্ছে, তখন কেন একটি অমানবিক ও অবৈধ সরবরাহব্যবস্থাকে পরোক্ষভাবে টিকিয়ে রাখা হবে? ‘আসল হাড় স্পর্শ না করলে শিক্ষা পূর্ণ হয় না’-এই যুক্তি বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে আর কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। চিকিৎসকদের অনেকেই ইতোমধ্যে বাস্তবসম্মত সমাধানের কথা বলছেন। প্রতিটি মেডিকেল কলেজে সীমিতসংখ্যক বৈধ কঙ্কাল সংরক্ষণ করে শিক্ষার্থীদের জন্য ‘বোনস ব্যাংক’ গড়ে তোলা যেতে পারে। ব্যক্তিগত পড়াশোনার জন্য প্লাস্টিক মডেল ও ডিজিটাল সিমুলেশন ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো-স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে স্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যাতে পরীক্ষাসহ শিক্ষাব্যবস্থায় অবৈধভাবে সংগৃহীত ‘আসল হাড়’ ব্যবহারের সংস্কৃতি বন্ধ হয়। লাশ পাহারা দিয়ে এই অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন আধুনিক ও মানবিক শিক্ষাব্যবস্থার দিকে সাহসী রূপান্তর। কারণ চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষা যদি মৃত মানুষের অসম্মানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তবে তা মানবতার মূল দর্শনের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে।