নুসরাত হত্যা মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজসহ দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল, খালাস ১০

নিজস্ব প্রতিবেদন | প্রকাশ: ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ০২:২৪ পিএম
নুসরাত হত্যা মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজসহ দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল, খালাস ১০
ছবি: সংগ্রহীত

ফেনীর সোনাগাজীর বহুল আলোচিত মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে চার আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং খালাস পেয়েছেন ১০ আসামি।

সোমবার (২৪ আগস্ট) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আসামিদের ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের ওপর এ রায় ঘোষণা করেন। মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা দুই আসামি হলেন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদদৌলা এবং শাহাদাত হোসেন শামীম।

হাইকোর্টে সাজা কমে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে উম্মে সুলতানা পপি, মোহাম্মদ নুরুদ্দিন, শাহাদাত হোসেন জাবেদ ও ইফতেখার হোসেন রানার। অন্য ১০ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

খালাস পাওয়া আসামিরা হলেন সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিন, সোনাগাজী পৌরসভার তৎকালীন কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম, মাদরাসার শিক্ষক হাফেজ আব্দুল কাদের, প্রভাষক আফসার উদ্দিন, সাইফুর রহমান, কামরুন নাহার মণি, আব্দুর রহিম শরিফ, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহিউদ্দিন শাকিল।

আদালতে আসামিদের পক্ষে অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান, ব্যারিস্টার মাসুদ হোসেন দোলন ও অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনিরসহ অন্য আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির।

এর আগে ২০ আগস্ট নুসরাত হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স, আসামিদের আপিল ও জেল আপিলের ওপর হাইকোর্টে শুনানি শেষ হয়। পরে ২৪ আগস্ট রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করা হয়। এর আগে ২৮ জুলাই মামলাটির শুনানি শুরু হয়েছিল।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসংক্রান্ত ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও অন্যান্য বিষয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির জন্য গত ১০ জুন হাইকোর্টের এই বিশেষ বেঞ্চ গঠন করা হয়। বেঞ্চটি ১৪ জুন থেকে কার্যক্রম শুরু করে।

যেভাবে হত্যা করা হয় নুসরাতকে

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নিজ কক্ষে ডেকে নুসরাতের শ্লীলতাহানি করেন। এ ঘটনায় মামলা হলে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।

মামলা তুলে না নেওয়ায় নুসরাতের ওপর চাপ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা দিতে মাদরাসায় গেলে তাকে সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে তার হাত-পা বেঁধে শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

গুরুতর দগ্ধ নুসরাতকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তাকে ফেনী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল তার মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। পরে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়। মামলার তদন্ত শেষে ১৬ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।

বিচারিক আদালতে ১৬ জনেরই মৃত্যুদণ্ড

২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল নুসরাত হত্যা মামলার রায় দেন। রায়ে ১৬ আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড করা হয়েছিল।

ওই ১৬ আসামির মধ্যে ছিলেন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিন, সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম, মাদরাসার শিক্ষক হাফেজ আব্দুল কাদের, প্রভাষক আফসার উদ্দিন, নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সাইফুর রহমান, মোহাম্মদ জোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, কামরুন নাহার মণি, উম্মে সুলতানা পপি, আব্দুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহিউদ্দিন শাকিল।

বিচারিক আদালতের মৃত্যুদণ্ডের পর মামলার নথিপত্র ডেথ রেফারেন্সের জন্য হাইকোর্টে পাঠানো হয়। ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর নথিপত্র হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় পৌঁছায় এবং ১৪০/১৯ ডেথ রেফারেন্স হিসেবে মামলাটি নম্বরভুক্ত হয়। চাঞ্চল্যকর মামলা হিসেবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এর পেপারবুক তৈরি করা হয়। আসামিরাও নিজেদের দণ্ডের বিরুদ্ধে পৃথক আপিল ও জেল আপিল করেন।

দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে হাইকোর্টে মামলাটির শুনানি শুরু হয় ২০২৬ সালের ২৮ জুলাই। ২০ আগস্ট শুনানি শেষ হওয়ার পর সোমবার রায় ঘোষণা করা হলো।

রায়ের পর আইনজীবীর বক্তব্য

মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস পাওয়া আসামি ইফতেখার উদ্দিন রানার আইনজীবী আদনান ইয়াজদানী রায়ের পর বলেন, মামলায় ৮৭ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। কিন্তু তার মক্কেলের সম্পৃক্ততার বিষয়ে কোনো সাক্ষী বক্তব্য দেননি বলে তিনি দাবি করেন। তার আরও দাবি, ইফতেখারের স্বীকারোক্তি আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ পুলিশ নির্যাতন করে সেটি নিয়েছে।

হাইকোর্টের রায়ে বিচারিক আদালতের দেওয়া ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে দুইজনের দণ্ড বহাল থাকল। চারজনের সাজা কমে হলো যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং বাকি ১০ আসামি পেলেন খালাস।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে