রোহিঙ্গা সংকট আরও জটিল, সমাধানে আন্তর্জাতিক চাপ জরুরি: শামা ওবায়েদ

নিজস্ব প্রতিবেদন | প্রকাশ: ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:১১ পিএম
রোহিঙ্গা সংকট আরও জটিল, সমাধানে আন্তর্জাতিক চাপ জরুরি: শামা ওবায়েদ

রোহিঙ্গা সংকট আরও জটিল হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, মিয়ানমারের সীমান্তের ওপারে দেশটির সরকার, আরাকান আর্মিসহ বিভিন্ন পক্ষ সক্রিয় থাকায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। এর সঙ্গে বিভিন্ন দেশের স্বার্থও জড়িত। ফলে আন্তর্জাতিক চাপ ছাড়া এ সংকটের সমাধান করা কঠিন।

শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর নন রেসিডেন্ট বাংলাদেশি (সিএনআরবি) আয়োজিত ‘আসন্ন জাতিসংঘ সম্মেলন ও বাংলাদেশ ব্র্যান্ডিং’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি।

শামা ওবায়েদ বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের বয়স প্রায় ১০ বছর। এটি বাংলাদেশের তৈরি কোনো সমস্যা নয়। অথচ বছরের পর বছর ধরে এর বড় ধরনের চাপ বাংলাদেশকে বহন করতে হচ্ছে। এবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনেও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি অধিবেশন হবে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী অংশ নেবেন।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর মতে, দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হলেও বাস্তবে পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত হয়েছে। মিয়ানমারের সীমান্তের ওপারে একাধিক পক্ষের সক্রিয়তা এবং বিভিন্ন দেশের স্বার্থের কারণে সংকটের সমাধান আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিকভাবে চাপ সৃষ্টি করা ছাড়া রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান করা কঠিন। দেশের বাইরে থাকা বাংলাদেশিরাও নিজ নিজ অবস্থান থেকে এ বিষয়ে ভূমিকা রাখতে পারেন।

আগামী ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শুরু হবে। উন্নয়নের অধিকার ঘোষণার চার দশক, ডারবান ঘোষণার রৌপ্যজয়ন্তী, জলবায়ু পরিবর্তন, অতিমারি প্রতিরোধ ও পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণসহ গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক বিষয় সেখানে আলোচনায় আসবে।

শামা ওবায়েদ বলেন, এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এটি বাংলাদেশের নতুন যাত্রা, সম্ভাবনা ও আকাঙ্ক্ষাকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক, আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল ও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের গল্প বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার বড় সুযোগ এবার পাওয়া যেতে পারে। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ পররাষ্ট্রনীতিকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের সম্ভাবনা তুলে ধরতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থ, বাংলাদেশের সম্ভাবনা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়গুলো সেখানে গুরুত্ব পাবে। পাশাপাশি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এ অধিবেশনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সভাপতিত্ব করবেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

আলোচনা সভায় দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়েও কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা এক জায়গা থেকে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তার ভাষায়, “ওয়ান স্টপ সার্ভিসের আদলে ‘বাংলাদেশ ইনভেস্ট’ নামে একটি আইন পাস হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যেন ১০ জায়গায় ঘুরে বেড়াতে না হয় এবং এক পয়েন্ট থেকেই প্রয়োজনীয় সব সুবিধা পান, সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে।”

তিনি জানান, বিনিয়োগকারীদের জন্য ডিজিটাল সেবা আরও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। কোম্পানি নিবন্ধনসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কাজ অনলাইনে সহজে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরাও যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে দেশে বিনিয়োগ করতে পারেন, সে ধরনের পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলছে।

অর্থনৈতিক কূটনীতিকে সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে শামা ওবায়েদ বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি ও বিপর্যস্ত ব্যাংকিং খাত পেয়েছে। সেই পরিস্থিতি থেকে অর্থনীতিকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে সময় প্রয়োজন।

ব্যাংকিং খাতকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার পাশাপাশি বিনিয়োগের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে সরকার কাজ করছে বলে জানান তিনি। শুধু বিদেশিদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানালেই হবে না, বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে বলে মন্তব্য করেন প্রতিমন্ত্রী।

নাগরিকসেবা সহজ করতে ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান কার্ড’ উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন শামা ওবায়েদ। তিনি বলেন, একজন নাগরিকের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ছড়িয়ে থাকা তথ্য সমন্বয় করে একটি সমন্বিত ডেটাবেজ তৈরির কাজ চলছে।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ২০২৭ সালের মধ্যে প্রায় দুই লাখ প্রবাসী কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী।

দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, অবৈধ অভিবাসন ও দালালচক্রের কারণে অনেক বাংলাদেশি বিদেশে গিয়ে সমস্যায় পড়ছেন।

শামা ওবায়েদ বলেন, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিরা রয়েছেন। তবে অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা দেশের ভাবমূর্তির জন্যও সমস্যা তৈরি করছে।

তিনি বলেন, অনেক বাংলাদেশি দালালচক্রের খপ্পরে পড়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে লিবিয়া থেকে ইতালি বা স্পেনে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় তাদের মাঝসমুদ্রে ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে, অনেকে মারা যান।

অবৈধ অভিবাসন মোকাবিলায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করছে বলে জানান তিনি। দক্ষ জনশক্তিকে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও পেশাগত প্রশিক্ষণ দিয়ে বৈধ পথে বিদেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অভিবাসনসংক্রান্ত একটি বিশেষ দপ্তর চালু করা হয়েছে বলেও জানান শামা ওবায়েদ। অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধ এবং প্রবাসীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে দপ্তরটি কাজ করবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশকে আরও ভ্রমণ ও বিনিয়োগবান্ধব করতে ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার বিকল্প উৎস খুঁজছে বলেও জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। প্রয়োজনে আফ্রিকা থেকেও জ্বালানি আমদানির কথা বলেন তিনি।

শামা ওবায়েদ বলেন, সম্ভাব্য সব বিকল্প উৎস ব্যবহার করে জ্বালানি সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করা হচ্ছে। এলএনজি সরবরাহ বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন জায়গায় চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে আফ্রিকার দেশগুলোতেও জ্বালানি উৎসের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে, কোনো একটি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল থাকা অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। জ্বালানির পাশাপাশি অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রেও উৎস বহুমুখীকরণ জরুরি।

অর্থনীতির বহুমুখীকরণের অংশ হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, এলএনজির নতুন উৎস এবং ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনা নিয়ে সরকার কাজ করছে বলে জানান তিনি। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে চীন ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী গুরুত্ব দিচ্ছেন উল্লেখ করে শামা ওবায়েদ বলেন, সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী যে ভবনে বসেন, সেটিকে শতভাগ সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনা হয়েছে। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরেও যতটা সম্ভব সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের চেষ্টা করা হচ্ছে।

দেশের অর্থনীতিকে বহুমুখী করার পাশাপাশি সৃজনশীল অর্থনীতি, কুটিরশিল্প, হস্তশিল্প ও স্থানীয় পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী।

পাটকে বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরিবেশবান্ধব ও বায়োডিগ্রেডেবল ফাইবার হিসেবে পাট ও পাটজাত পণ্যকে আন্তর্জাতিকভাবে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে চায় সরকার।

পর্যটন, ব্যবসা, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে উল্লেখ করে শামা ওবায়েদ বলেন, বাংলাদেশ শুধু সমস্যার দেশ নয়, সম্ভাবনারও দেশ।

তিনি বলেন, সরকার একা সব পরিবর্তন করতে পারবে না। বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে একটি আধুনিক, আত্মবিশ্বাসী ও সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে তুলে ধরতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

আলোচনা সভায় সেন্টার ফর নন রেসিডেন্ট বাংলাদেশির চেয়ারপারসন এম এস সেকিল চৌধুরী সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন। এতে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ, সাবেক গুম কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন এবং ব্র্যাক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তারেক রেফাত উল্লাহ খান বক্তব্য দেন।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে