কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে ৬২৪ আটক, দাউদকান্দিতে থানার দরজা ভেঙে বের ২২

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:০৬ পিএম
কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে ৬২৪ আটক, দাউদকান্দিতে থানার দরজা ভেঙে বের ২২

কুমিল্লার ১৮টি থানায় একযোগে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে ৬২৪ জনকে আটক করেছে পুলিশ। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যার পর শুরু হওয়া এ অভিযান চলে রাত দেড়টা পর্যন্ত। আটকদের মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীও রয়েছে। তাদের আগের কোনো অপরাধে সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

কুমিল্লা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও মিডিয়া কর্মকর্তা লুৎফর রহমান জানান, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে উঠতি বয়সী কিশোরদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামানের নির্দেশে জেলার ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান চালানো হয়।

নগরীর বিভিন্ন স্থানসহ যেসব এলাকায় বখাটেদের উৎপাত ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা রয়েছে, সেসব এলাকায় অভিযান চালানো হয়েছে। আটকদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। কিশোররা যাতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াতে না পারে, সে জন্য এ ধরনের অভিযান নিয়মিত চালানোর কথাও জানিয়েছে জেলা পুলিশ।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় ৭৫ জন, সদর দক্ষিণ মডেল থানায় ৪৬, বুড়িচং থানায় ৫০, মনোহরগঞ্জ থানায় ৪১, দাউদকান্দি থানায় ৫৯ এবং লাকসাম থানায় ৩৫ জনকে আটক করা হয়েছে। অন্য থানাগুলোতে আটক ব্যক্তিদের তথ্যও যাচাই করা হচ্ছে।

কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার জানান, আটকদের মধ্যে কারা শিক্ষার্থী, সেটিও যাচাই করা হচ্ছে। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেলে তাদের আদালতে পাঠানো হবে। অন্যদের সতর্ক করে পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হতে পারে।

থানার সামনে অভিভাবকদের ভিড়

অভিযান শুরুর পর রাত আটটা থেকে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানা, সদর দক্ষিণ মডেল থানাসহ বিভিন্ন থানার সামনে আটকদের স্বজনদের ভিড় দেখা যায়। কিশোরদের আটকের খবর পেয়ে অনেক অভিভাবক থানায় ছুটে আসেন। তাদের অনেকে গভীর রাত পর্যন্ত থানার বাইরে অপেক্ষা করেন।

কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় আটক কয়েকজনকে নগরের ঈদগাহ মাঠ থেকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে একটি পরিচিত বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীও ছিল। ওই শিক্ষার্থীর বাবা প্রবাসে থাকেন। ছেলেকে আটকের খবর পেয়ে তার মা থানায় ছুটে আসেন।

ওই নারী জানান, সন্ধ্যার পর তার ছেলে প্রাইভেট পড়তে গিয়েছিল। রাত সাড়ে নয়টার দিকে তিনি জানতে পারেন, তাকে থানায় আটক করা হয়েছে। পরে ছেলের স্কুলের পরিচয়পত্র নিয়ে থানায় যান। পুলিশ তাকে জানিয়েছে, কোনো অপরাধে জড়িত না থাকলে যাচাই করে ছেড়ে দেওয়া হবে। কয়েকজন সেখানে আড্ডা দিচ্ছিল বলেও তিনি জানতে পারেন।

সদর দক্ষিণ মডেল থানা এলাকায় আটক কিশোরদের বেশির ভাগকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশ ও কোটবাড়ির বিভিন্ন স্থান থেকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরও রয়েছে। তার বাবা কোটবাড়ির একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। ছেলেকে আটকের খবর পেয়ে তিনি মধ্যরাত পর্যন্ত থানার সামনে অপেক্ষা করেন।

ওই অভিভাবকের ভাষ্য, সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে কথা বলার সময় তার ছেলেকে আটক করা হয়। এ বছর সে এসএসসি পাস করেছে। কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে তার ছেলের কোনো সম্পৃক্ততা নেই দাবি করে তিনি বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান ইতিবাচক। তবে অভিযানের নামে শিক্ষার্থীসহ ভালো ছেলেদেরও একসঙ্গে আটক করলে সমস্যার সমাধান হবে না।

দাউদকান্দিতে থানার দরজা ভেঙে ২২ কিশোরের বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা

কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানের মধ্যে দাউদকান্দি মডেল থানায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সেখানে সন্দেহভাজন হিসেবে ২৮ কিশোরকে আটক করা হয়েছিল। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) রাত ১০টার দিকে তাদের মধ্যে ২২ জন থানার একটি কক্ষের চেয়ার-টেবিল ও দরজা ভেঙে বেরিয়ে যায়।

পরে থানার সামনে জড়ো হয়ে ওই কিশোরদের একটি অংশ ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিতে থাকে। এ সময় আটক কিশোরদের স্বজন ও স্থানীয় লোকজনও থানার সামনে জড়ো হন। বিকেল থেকেই সেখানে অভিভাবকদের ভিড় বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে হট্টগোল ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, থানার একটি কক্ষে আটক রাখা কিশোরদের কয়েকজন চেয়ার-টেবিল ও দরজা ভেঙে বেরিয়ে আসে। পরে তাদের একটি অংশ থানার সামনে অবস্থান নেয়।

পুলিশি অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া সদস্যদের ভাষ্য, আটক সবাই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। তবে দাউদকান্দি মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম বলেন, অপ্রয়োজনে ঘোরাফেরার কারণে সন্দেহভাজন হিসেবে ২৮ জনকে আটক করা হয়েছিল। তাদের স্বজনরা একসঙ্গে থানায় আসায় ভিড় তৈরি হয়।

রাত সাড়ে ১০টার দিকে ২২ জনকে অভিভাবকের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে জানিয়ে ওসি বলেন, যাচাই-বাছাই শেষে বাকি ছয়জনের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি হ্যান্ডমাইকে বক্তব্য দিয়ে থানার সামনে জড়ো হওয়া লোকজনকে শান্ত করার চেষ্টা করেন।

অপ্রতিম হত্যার পর নতুন করে আলোচনায় কিশোর গ্যাং

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নতুন নয়। তবে ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।

১৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে কোটবাড়ির গন্ধমতী এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। পরদিন শনিবার দুপুরে সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান এবং কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে দুজন কিশোর। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা ১৯ বছর বয়সী সাইফুল ইসলাম তুহিনসহ তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। অপর ১৯ বছর বয়সী তরুণকে হত্যাকাণ্ডের সহযোগী হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

অপ্রতিম হত্যার পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ওঠে। এর পর কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার, বিভিন্ন দলের তৎপরতা ও অপরাধে জড়িয়ে পড়ার তথ্য নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

নগরে সক্রিয় একাধিক দল

স্থানীয় সূত্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন নথির তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লা নগরে কিং স্কোয়াড, স্কোয়াড বা রতন গ্রুপ, ইগল, সিবিকে ও ক্রাইম সেটআপসহ কয়েকটি কিশোর গ্যাং বা দল সক্রিয় রয়েছে। অপু ও সাব্বিরের নামে আরও দুটি দলের কথাও বিভিন্ন নথি ও স্থানীয় সূত্রে এসেছে।

তবে কুমিল্লা জেলায় কিশোর গ্যাংয়ের কোনো হালনাগাদ তালিকা পুলিশের কাছে নেই।

কুমিল্লা নগরে ২০১৫ সালের দিকে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। তখন তিন থেকে চারটি দল সক্রিয় ছিল। ২০২২ সালের দিকে আলোচিত দলের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ২০টিতে দাঁড়ায়। ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অন্তত ১২টি হত্যাকাণ্ডে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের নাম এসেছে।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ২৫০ জনের বেশি কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে কিশোর হওয়ায় অনেকে গ্রেপ্তারের পর দ্রুত মুক্তি পেয়ে আবার একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। অনেকের মা-বাবাকে ডেকে মুচলেকাও নেওয়া হয়েছে।

নতুন করে ১৮ থানায় একযোগে অভিযান চালানোর বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা যাতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াতে না পারে, সে জন্য জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে এ ধরনের অভিযান নিয়মিত পরিচালনা করা হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে