বন রক্ষিদের ঈদ আনন্দ

এফএনএস (মোঃ রিয়াছাদ আলী; কয়রা, খুলনা) : | প্রকাশ: ৭ জুন, ২০২৫, ০৭:০১ পিএম
বন রক্ষিদের ঈদ আনন্দ

পবিত্র ঈদুল আজহার দিন যখন সারাদেশের মানুষ পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছেন, ঠিক তখন বিশ্বের ঐতিহ্য সুন্দরবনের সম্পদ রক্ষায় ঐ বনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে দায়িত্ব পালন করেছেন বন রক্ষীরা। ঈদ উদযাপনের এই সময়ে তারা নিজেদের আনন্দকে পাশে সরিয়ে রেখে সতর্ক অবস্থানে ছিলেন সুন্দরবনের প্রতিটি নদী ও খালে। তারা ঈদের দিনটা কাটিয়েছি টহল কার্যক্রমে। বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রতিবছর ঈদের সময় চোরা শিকারি চক্র সুন্দরবনে হরিণসহ বন্য প্রাণী শিকারের অপতপরতা চালায়। তাই ঈদে সুন্দরবনে বন বিভাগে কর্মরত সব কর্মকর্তা ও বনরক্ষীদের ছুটি বাতিল করে কর্মস্থলে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আজ শনিবার (৭ জুন) ঈদের সকালে সুন্দরবনের বিভিন্ন ফরেস্ট স্টেশন ও টহল ফাঁড়ির কয়েকজন কর্মকর্তা ও বনরক্ষীর সঙ্গে কথা হয়। তারা বলেন, সবাই একসঙ্গে ছুটিতে গেলে সুন্দরবনে নজরদারি করবেন কে? ঈদের দিন বনে থাকতে খারাপ লাগলেও সুন্দরবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তাদেরই। ঈদের দিন সকালে সুন্দরবন সংলগ্ন লোকালয়ে গিয়ে দেখা যায়, পরিবার-পরিজন ছেড়ে সুন্দরবনে কাজ করছেন বনরক্ষীরা। সুন্দরবনের শাকবাড়িয়া নদী ধরে গহিন বনের কলুখালি খালের দিকে একটি ছোট নৌকা চালিয়ে কয়েকজন বনরক্ষী এগিয়ে যাচ্ছিলেন। ওই টহল দলের সদস্য সোহাগ মোল্যা বলেন, সুন্দরবনের চাকরিতে প্রায় ঈদেই ছুটি মেলে না। বিশেষ করে কুরবানির ঈদে বাড়িতে যেতে পারেন না। পরিবার ছাড়া ঈদ করা খুবই কষ্টের। তবে মানিয়ে নিতে হয়। একসময় খারাপ লাগত। এখন আর খারাপ লাগে না। পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য কয়েক মাস ধরে গহিন সুন্দরবনে আছেন বনরক্ষী আবদুল হাকিম। তার অবস্থান এখন ভোমোরখালী বন টহল ফাঁড়িতে। লোকালয় থেকে নৌযানে সেখানে পৌঁছাতে সাত-আট ঘণ্টা লাগে। পাঁচজন সহকর্মী নিয়ে সেখানেই ঈদ উদযাপন করছেন তিনি। ঐ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আমার বাড়ি বরিশালে। মা-বাবা পরিবারসহ সেখানেই থাকেন। আমার জঙ্গলে চাকরির গত ৬ বছরে একটি ঈদ পরিবারের সঙ্গে কাটিয়েছি। বাকি সব সুন্দরবনে। মা-বাবা, স্ত্রী, সন্তানদের সঙ্গে ঈদ করতে পারছি না বলে একটু তো মন খারাপ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু দায়িত্ব আরও বড় বিষয়। মূলত এ বছর প্রবেশ নিষিদ্ধ সময়ে ঈদটা উদযাপিত হচ্ছে। তাই এই সময়টায় যাতে কেউ সুন্দরবনের ক্ষতি করতে না পারে, সে জন্য সারাক্ষণ টহলে থাকতে হচ্ছে। সুন্দরবনের বজবজা টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ লুৎফর রহমান বলেন, ‘আমি সুন্দরবনের চাকরীরত অবস্থায়  একবার মাত্র পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে পেরেছি। গত বছর ঈদের সময় সুন্দরবনের ভম্ররখালী টহল ফাঁড়িতে কর্মরত ছিলাম। গহিন বনের ওই এলাকায় মুঠোফোনের নেটওয়ার্কও পাওয়া যায় না। ঈদের দিন আমরা ৪ জন স্টাফ মিলে একটি মুরগি জবাই করে আর একটু সেমাই রান্না করে নিজেদের মতো করে ঈদ পালন করেছিলাম। এবারও তা-করছি। গেওয়াখালী টহল ফাঁড়ির বন কর্মকর্তা মোঃ রাসেল আহমেদ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, ‘আসলে চাকরির জন্য সবকিছু মেনে নিতে হয়। আমার দুই সন্তান। ছেলেটা পড়ে তৃতীয় শ্রেণিতে আর মেয়েটা এবার স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে। গত পরশু ছোট মেয়েটা ফোন করে বলেছে, “আব্বু বাড়ি আসবা কবে?চ্ আমি বললাম, আম্মু এবার একটু দেরি হবে। মেয়ে আবার জিজ্ঞেস করে, কত দিন দেরি হবে? আমি আর কিছু বলিনি। কারণ, কোনো একটা তারিখ বললে ক্যালেন্ডারের পাতায় ওই তারিখে দাগ দিয়ে রেখে দিন গুনতে থাকে। সুন্দরবনের নলিয়ান ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা মোঃ শমসের আলী  বলেন, ‘আজ পরিবার-প্রিয়জন নিয়ে সবাই যখন ঈদ আনন্দ উপভোগ করছেন, ঠিক এ সময় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে আমরা অবস্থান করছি নির্জন সুন্দরবনে। সুন্দরবনের বানিয়াখালী ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা মোঃ মামুন মাতববার বলেন, ‘পরিবার থেকে দূরে থাকলেও আমার স্টেশনটি লোকালয়ের কাছাকাছি হওয়ায় ঈদের নামাজ পড়তে পেরেছি। কিন্তু সুন্দরবনের নীলকোমল, পাতকোষ্টা, কাগাদোবেকি, গেওয়াখালী, আদাচাই, ভদ্রা, পাশাখালী, শিবসা সহ অনেকগুলো টহল ফাঁড়ি রয়েছে গহিন বনের মধ্যে। যেখানে মুঠোফোনের নেটওয়ার্কও নেই। ওই সব জায়গায় যারা দায়িত্বে আছেন, তাঁরা ঈদের নামাজও পড়তে পারেন না। ঈদের কয়েক দিন আগে লোকালয়ে এসে পানি আর বাজার-সদাই নিয়ে গেছেন। হয়তো আজ নিজেরাই সেমাই রান্না করে খাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন। কিন্তু শুধু বন বিভাগ সব ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। দুর্গম ও ভয়ংকর বনাঞ্চলে বনপ্রহরীদের সব সময় জীবন বাজি রেখে দায়িত্ব পালন করতে হয়। বেতন ছাড়া অন্য তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। সুন্দরবন খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মোঃ শরিফুল ইসলাম বলেন, ঈদের দিনেও সুন্দরবনে কর্মরত স্টাফরা জীবনের ঝুকি নিয়ে টহল কার্যক্রম করে থাকে। ঈদের আনন্দ বলে কিছু নেই তাদের। সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেডএম হাছানুর রহমান বলেন, যেকোনো ছুটির সময় দুর্বৃত্তরা বনের সম্পদ লুটপাট ও ধ্বংসের সুযোগ নিতে চায়। এ কারণে এ বছরও সুন্দরবনের ভেতর সব ফরেস্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঈদের ছুটি বাতিল করে নিজ নিজ কর্মস্থলে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।