ধর্ষণকান্ডে উত্তাল খাগড়াছড়ি টানা অবরোধে স্থবির জনজীবন

এফএনএস (মোবারক হোসেন; লক্ষ্ণীছড়ি, খাগড়াছড়ি) : | প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫, ০৮:৫৪ পিএম
ধর্ষণকান্ডে উত্তাল খাগড়াছড়ি টানা অবরোধে স্থবির জনজীবন

পাহাড়ি এক কিশোরীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের প্রতিবাদে টানা কয়েক দিনের অবরোধ, মিছিল ও সমাবেশে খাগড়াছড়ি জেলা এখন থমথমে পরিবেশে বিরাজ করঝছ। ‘জুম্ম ছাত্র-জনতা’র ডাকে রোববার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে নতুন করে সড়ক অবরোধ শুরু হয়। এতে শহরে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে, অধিকাংশ দোকান-পাট বন্ধ রয়েছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী টহল দিচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ৭ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। গুইমারা উপজেলায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে অবরোধকারীরা সেনাবাহিনীর ওপর হামলা করেছে। এতে ১১ সেনাবাহিনী, ৩ পুলিশ ও সাংবকাদিকসহ অন্তত ২০জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পার্বত্য উপদেষ্টা সপ্রদীপ চাকমা মতবিনিময় সভায় শান্তির আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, অস্ত্র থাকবে শুধু নিরাপত্তাবাহিনীর কাছে, অন্য কারো কাছে নয়। অপরদিকে ইউপিডিএফ গুইমারায় অবরোধকারী ও নিরীহ পাহাড়িদের ওপর হামলা, অগ্নিসংযোগ, গ্রেফতার-নির্যাতনের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।

এর আগে শনিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) অবরোধ চলাকালে পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। দুপুরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সদর উপজেলা, পৌরসভা এলাকা ও গুইমারা উপজেলায় অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন। তবে পাহাড়িদের অভিযোগ, ১৪৪ ধারা জারির পরও তাদের ওপর হামলা হয়েছে। এ ঘটনার প্রতিবাদে চার দফা দাবিতে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ ঘোষণা করা হয়।

শনিবার দুপুরে সদর উপজেলা পরিষদ এলাকা, মহাজনপাড়া, নারিকেলবাগান, চেঙ্গী স্কোয়ার ও শহীদ কাদের সড়কে সংঘর্ষ বাঁধে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ফাঁকা গুলি ও টিয়ারশেল ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ সময় স্বনির্ভর ও নারিকেলবাগান এলাকায় কয়েকটি দোকানে হামলা হয়। সহিংসতায় অন—ত ২৫ জন আহত হয়েছেন, গুরুতর আহত একজনকে চট্টগ্রামে পাঠানো হয়েছে। অবরোধ চলাকালে বিভিন্ন স্থানে গাছের গুড়ি ফেলে ও টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে সড়কে ব্যারিকেড দেওয়া হয়।

আলুটিলায় একটি অ্যাম্বুলেন্স ও নারানখাইয়া এলাকায় একটি অটোরিকশা ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। এতে সাজেক ভ্রমণে যাওয়া প্রায় দুই হাজার পর্যটক আটকা পড়েন। পরে বিশেষ নিরাপত্তায় তারা খাগড়াছড়ি হয়ে নিজ নিজ গন—ব্যে ফিরে যান।

শনিবার রাতে খাগড়াছড়ির একটি বৌদ্ধবিহারে নাশকতার প্রস্তুতিকালে ৩ যুবককে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অন্যদিকে রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একাধিকবার অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচির ঘোষণা ও প্রত্যাহারের খবর ছড়িয়ে পড়ে, যা জনমনে আরও আতঙ্ক বাড়ায়। মহাজন পাড়ায় ইন্দোনেশিয়ার একটি বিক্ষোভের পুরোনো ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে গুজব ছড়ানোর অভিযোগ ওঠে। 

এদিকে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় এক স্কুল শিক্ষার্থীকে ধর্ষনের প্রতিবাদ ও ধর্ষনকারীদের গ্রেপ্তার করে শাস্তির দাবীতে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে জুম্ম ছাত্র-জনতার ডাকা অনির্দিষ্ট কালের জন্য ডাকা সড়ক অবরোধে অপৃতিকর ঝামেলা এরাতে গুইমারা উপজেলা প্রশাসন ২৭ সেপ্টম্বর বিকাল তিনটা থেকে অনির্দিস্ট সময়ের জন্য থেকে ১৪৪ ধারা জারি করলেও তা ভঙ্গ করে ২৮ সেপ্টেম্বর সকাল ১১ ঘটিকায় গুইমারা উপজেলার খাদ্য গুদামের সামনে অবরোধ কারীরা রাস্তায় জড়ো হয়ে টায়ার জালিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।

খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে হাজির হলে অবরোধ কারীদের পক্ষ থেকে ইট-পাটকেল ছুঁরে গুইমারা রিজিয়নের আওতাধীন সিন্দোকছড়ি জোন উপ-অধিনায়ক মেজর মোঃ মাজহার হোসেন রাব্বানী সহ সেনাবাহিনীর ১১ সদস্যকে আহত করা হয়। এসময় দায়িত্বরত সাংবাদিকের উপর হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। এতে বিজয় টিভির জেলা প্রতিনিধি এম সাইফুর রহমান গুরুতর আহত হন। সে বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী ফাঁকা গুলি বর্ষণ করে।

এদিকে রোববার (২৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে মতবিনিময় সভায় তিনি পার্বত্য উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা বলেন, “নিরাপত্তা বাহিনীর বাইরে কারো হাতে অস্ত্র থাকবে না। সবাইকে শান্ত থাকতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে সহযোগিতা করতে হবে। খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে সকাল ১০টা থেকে বেলা দেড়টা পর্যন্ত এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। 

উল্লেখ্য, গত ২৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার সিঙ্গিনালা এলাকায় অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়। এ ঘটনায় শয়ন শীল (১৯) নামে একজনকে সেনাবাহিনীর সহায়তায় গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অপর আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। এদিকে রোববার থেকে শারদীয় দুর্গোৎসব শুরু হওয়ায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সামগ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার মো. আরেফিন জুয়েল বলেন, “বর্তমানে সার্বিক পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানাচ্ছি।” জেলা প্রশাসক এবিএম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার জানিয়েছেন, পরিস্থিতি উন্নত না হওয়া পর্যন— ১৪৪ ধারা বহাল থাকবে।

এদিকে সাবেক সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড চয়ারম্যান ওয়াদুদ ভূইয়া সকল পক্ষকে শান্ত থেকে কারো উস্কানিতে পা না বাড়ানোর আহবান জানিয়েছেন। তিনি সকলকে সহনশীল ও ধৈর্য ধরার অণুরোধ করেন। 

ইউপিডিএফ’র নিন্দা ও প্রতিবাদ: অবরোধকারী ও নিরীহ পাহাড়িদের ওপর হামলা, অগ্নিসংযোগ, গ্রেফতার-নির্যাতনের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। সংগঠনটির মুখপাত্র অংগ্য মারমা খাগড়াছড়ির সিঙ্গিনালায় কিশোরী ছাত্রীকে গণধর্ষণের সাথে জড়িতদের গ্রেফতার না করে খাগড়াছড়ি সদরের পেরাছড়া, ভাইবোনছড়ায় নিরীহ পাহাড়িদের গ্রেফতার, শারীরিক নির্যাতন ও হয়রানি-হেনস্তা, দোকানপাটে হামলা-ভাঙচুর এবং গুইমারায় অবরোধকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ২৮ সেপ্টেম্বর রবিবার এক বিবৃতিতে অংগ্য মারমা আরও বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত অধিকাংশ সেনা কর্মকর্তার সেটলারদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব ও পাহাড়ি বিদ্বেষী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বার বার সাম্প্রদায়িক হামলা ও ধর্ষণের মতো জঘন্য ঘটনা ঘটে এ অঞ্চলকে অশান্ত করে তুলছে। তিনি অবিলম্বে গ্রেফতারকৃতদের মুক্তি, আহতদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা, ক্ষতিগ্রস্থদের ক্ষতিপূরণ প্রদান, ধর্ষকদের গ্রেফতার এবং গুইমারায় গুলিবর্ষণ ও অগ্নিসংযোগকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানান।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে